হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুদ্ধে ইরানের নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র কি ফাঁদে পড়ল

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনা। কাগজে-কলমে এই লক্ষ্য হয়তো এখনো আছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগের অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে তাদের এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

মাঠের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এই অভিযান ইরানের শাসনব্যবস্থায় ধস নামানোর জন্য যে ধরনের জনরোষ বা অস্থিরতা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। উল্টো চার দিনের মাথায় যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়ার বদলে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও বেশ স্থিতিশীলই আছে। শুধু তা–ই নয়, শত্রুপক্ষের বিভিন্ন অবস্থানে পাল্টা আঘাতও হেনে যাচ্ছে দেশটি।

এই পরিস্থিতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আগের হিসাব নতুন করে মেলাতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আগের সব অনুমান এখন প্রশ্নের মুখে। আর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানও আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না।

এদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় একদমই সাড়া দিচ্ছে না ইরান। পাশাপাশি যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা আছে, তাদেরও প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে দেশটি। বিষয়টি নিছক জেদ বা আদর্শিক অনমনীয়তা নয়, এটি তেহরানের একটি সুচিন্তিত রণকৌশলেরই প্রতিফলন। তেহরান মনে করছে, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি শত্রুপক্ষকে ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার সুযোগ করে দেবে।

ইরানের ড্রোন হামলার পর বাহরাইনের মানামায় একটি বহুতল ভবনে আগুনে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি

দুটি বাস্তবমুখী পরিস্থিতি এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। প্রথমত, খোদ মার্কিন প্রশাসনই স্বীকার করেছে যে এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী বা সীমিত না-ও হতে পারে। পেন্টাগনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, ‘অতিরিক্ত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।’

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য শঙ্কা দূর করার চেষ্টা করে বলেছেন, ‘এটি ইরাক নয়, এটি অন্তহীন কোনো যুদ্ধও নয়।’ তবে একটি ‘অন্তহীন’ পরিস্থিতির সম্ভাবনা অস্বীকার করার এ প্রবণতাই প্রমাণ করে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিষয়টি এখন জন-আলোচনার অংশে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কণ্ঠেও একই সুর। এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই যৌথ প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে, যার মাধ্যমে তারা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রশমিত করতে চায়। কারণ, তাদের অভিযানের প্রাথমিক সেই ‘শক অ্যান্ড অউ’ (আকস্মিক ও প্রচণ্ড আঘাত) পর্যায়টি প্রত্যাশিত কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

তা ছাড়া ইসরায়েল যে ইরানে হামলা চালাবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চড়াও হবে’—মার্কিন প্রশাসন তা আগে থেকেই জানত বলে স্বীকার করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এই স্বীকারোক্তির পর তিনি অভিযানের পরিধি কমানোর বদলে বরং এর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করেছেন। রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে এবং সেই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে যতটুকু সময় প্রয়োজন, আমরা ঠিক ততটুকুই করব।’

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে তেল আবিবের একটি শেল্টারে ইসরায়েলিরা। যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলিরাও এখন অনেকটা বন্দী জীবনে

ইরানে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন’ বা শাসন পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে হেগসেথ যে মন্তব্য করেছিলেন, রুবিওর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নতুন করে গুরুত্বারোপ সেই একই বিষয়কে সামনে আনছে। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রাথমিক কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে।

কৌশলগত সাফল্যের ফুলঝুরি কিংবা যুদ্ধের গতি বজায় রাখতে ক্ষয়ক্ষতির অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান প্রচার করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতির এই বিশাল ব্যবধান নতুন কোনো প্রস্থানের পথ খোঁজার চাপ তৈরি করেছে।

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে শেষ পর্যন্ত স্থল অভিযানের প্রয়োজন পড়বে।

এই পটভূমিতে ইরানের বিরোধী পক্ষ এবং কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি ওয়াশিংটনের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। রুবিও যখন বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে স্থল অভিযানের অবস্থানে নেই। তবে প্রেসিডেন্টের হাতে বিকল্প রয়েছে। তিনি কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছেন না,’ তখন এটিই ইঙ্গিত দেয় যে শুরুর দিকের কৌশলগত ঘাটতি পুষিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ঝুঁকি নিতে এবং সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী একটি যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত হচ্ছে।

এ কাঠামোটি যেমন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব-নিকাশের ফসল, তেমনি এটি ইরানের নিজস্ব কৌশলগত পরিবর্তনেরও ফলাফল।

ইসরায়েলের ওপর মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরিবর্তে ইরান এখন তাদের রক্ষণব্যূহকে ক্লান্ত করে দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের এই কৌশল যেমন অভাবিত ছিল, তেমনি চমকপ্রদ ছিল খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো সেই শুরুর দিককার ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূলের হামলাটিও।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকার কয়েকটি ভবন

ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল

ইরানের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তেহরান সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরাসরি সমর্থন থাকায় কেবল ইসরায়েলের ওপর ক্ষয়ক্ষতি চালিয়ে কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফাটল ধরানো সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে, তারা এখন এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া।

তবে এই রণকৌশল তেহরানের জন্যও বেশ কিছু বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। খবর পাওয়া গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ করছেন। দেশটির একজন সামরিক কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে অকপটে বলেন, ‘হামলার প্রথম ধাক্কার পর নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আঞ্চলিক সামরিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মূল কেন্দ্রের সংযোগ তখন ভেঙে পড়েছিল।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকে ব্রিফিং পাওয়া ইউনিটগুলো নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল। দ্বিতীয় দিন সকালের মধ্যে আবার সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় এবং আমরা তার ফল পেতে শুরু করি। তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে এখনো বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।’

ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘বহুস্তরীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের যে সক্ষমতা রয়েছে, তাতে এই অঞ্চলে কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়ে সবচেয়ে বড় মূল্যটি চুকিয়েছি; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের মূল্য দিতে হবে আরও অনেক বেশি। তাদের লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট। তবে তারা যে সামরিক সম্পদগুলোকে অবজ্ঞা করেছিল বা খেয়াল করেনি, সেগুলো দিয়েই আমরা অন্তত আরও দুই মাস এই মাত্রার প্রতিরোধ বজায় রাখতে পারব। আমাদের মজুত এবং পরিকল্পনা এখনো অটুট।’

প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। যদিও ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর বাগাড়ম্বর একেবারে উবে যায়নি, তবে এর ওপর আগের সেই জোর এখন অনেকটাই স্তিমিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর তেহরানে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি।

সহ্যের পরীক্ষা

এই সহ্যক্ষমতার পরীক্ষার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্তত ছয়টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের উপর্যুপরি হামলা ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব উপসাগরীয় দেশ মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি পরিচালনা করছে, তারা এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের কিছু নির্দিষ্ট মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তারা জরুরি সহায়তা চেয়েছে।

ইরান এই সংঘাতকে কেবল ইসরায়েল-ইরান অক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের স্থায়িত্বের পরীক্ষা নিচ্ছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আমিরাত ও কাতারের নেতাদের সাম্প্রতিক আলোচনায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। খবর বেরিয়েছে, আমিরাত জানিয়েছে যে তারা ক্ষুব্ধ, কারণ ইরানের ওপর হামলার জন্য তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার না করা সত্ত্বেও তাদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। পুতিন আমিরাতের এই অসন্তোষের বার্তাটি তেহরানের কাছে পৌঁছে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

আবুধাবিতে জায়েদ বন্দরে হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে

এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর নেটওয়ার্ক ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেহরান এই কঠোর বার্তা দিচ্ছে, ইরান যদি যুদ্ধের এই পর্যায়টি পার করে দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তারা ওই দেশগুলোর ওপর আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ইরানের এই নতুন রণকৌশল মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভিতকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে এটি ইউরোপের কাছে ওয়াশিংটনের সেই চিরচেনা বার্তাটিকেও জটিল করে তুলছে, যেখানে তারা দাবি করে আসছিল যে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় মার্কিন উপস্থিতি অপরিহার্য।

ইরানের ‘যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়া’ কৌশলের সবচেয়ে বিপজ্জনক হাতিয়ার হিসেবে রয়ে গেছে জ্বালানি খাত এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে—ইরানের এমন হুমকিতে বিশ্ববাজার ও বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার এবং কাতার বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জ্বালানি তেলের দাম নাগালের মধ্যে রাখা একটি বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন ওয়াশিংটনের সেই অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। তেহরানের রণকৌশলটি অত্যন্ত সোজাসাপ্টা—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সীমিত থাকলেও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং নৌ–বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটিয়ে তারা ওয়াশিংটনের ওপর এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চায়।

যুদ্ধের এই ব্যয় যত বাড়বে, আলোচনার টেবিলে ইরানের দর–কষাকষির সক্ষমতাও ততটাই শক্তিশালী হবে; যদি সংঘাতটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক থাকে এবং অনিয়ন্ত্রিত কোনো গোষ্ঠী সংঘাতের দিকে মোড় না নেয়।

ইরানে অভ্যন্তরীণ সংঘাত

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বারবার জনরোষ তৈরির আহ্বান সত্ত্বেও ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী কোনো বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

তবে এর মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এখন সেই বিকল্প পথেই হাঁটতে শুরু করেছে, যা ইসরায়েলি মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। তা হলো ‘অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা’ তৈরি।

ইসরায়েলি একটি সূত্র বলেছে, ‘উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আজেরি, কুর্দি, লুর এবং সুন্নি গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তেহরানের প্রতি। অনেক দিক থেকেই তারা প্রস্তুত। একবার রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে গেলে তাদের সংগঠিত করা সম্ভব। আমরা আমেরিকানদের বলেছি যে এটি যুদ্ধের খরচ অনেক কমিয়ে দেবে।’

ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য এই কৌশলকে ‘দিবাস্বপ্ন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। পশ্চিম ইরানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইসরায়েল এর আগেও এই গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের ইরানে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে। আমরা ইরাকের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি।’

ওই ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই আমরা এই সম্ভাবনাটি নজরে রাখছিলাম এবং প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছি। যেসব কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, আমরা তাদের সতর্ক করে দিয়েছি। ইসরায়েলের উচিত এই অঞ্চলের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিভ্রম বা অলীক স্বপ্ন বিক্রি বন্ধ করা।’

ইরান কেবল ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেই হামলা চালায়নি, বরং তারা ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর (কেডিপিআই এবং প্যাক) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পগুলোতেও আঘাত হেনেছে। খবর পাওয়া গেছে, ইরবিলের কাছে অন্তত পাঁচটি ক্যাম্পে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইসরায়েল পশ্চিম ইরানে যে ‘প্রক্সি গ্রাউন্ড’ বা ভাড়াটে স্থলশক্তিকে সক্রিয় করতে চাইছে, তা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

যাহোক, এ ধরনের যেকোনো উত্তেজনা নতুন আঞ্চলিক সংকটের জন্ম দেবে, বিশেষ করে তুরস্ক এবং প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে সে ক্ষেত্রে এসব দেশের প্রতিক্রিয়া এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরুদ্ধে তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে এক ব্যক্তি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি ওপরে তুলে ধরেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পরিশেষে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই যুদ্ধের গতিপথ তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক সাফল্য দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং তা নির্ধারিত হবে কার ওপর কতটা ক্ষয়ক্ষতির বোঝা জমছে, তার ভারসাম্যের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতকে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রাণঘাতী লড়াই হিসেবে দেখছে। এর বিপরীতে ইরান সুপরিকল্পিতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমুখী চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, কূটনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানো—সবই একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইরানের লক্ষ্য হলো এই আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতকে এমন একটি সংকটে রূপান্তর করা, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক মিত্রজোট, বিশ্ব অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে সজোরে আঘাত করবে।

মূল প্রশ্নটি এখন আর কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সংঘাতের ফলে ওয়াশিংটনের যে সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে এবং যেসব দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে, তা চীনের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সময়সূচিকে কতটা প্রভাবিত করবে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—চীন যদি আরও বড় পরিসরে একই ধরনের ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’ বা যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তার মোকাবিলা করবে কীভাবে?

এই অর্থে, ইরান সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক পরীক্ষাই নয়, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের সহ্যক্ষমতার সীমারও একটি পরীক্ষা।