জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল
জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল

কুখ্যাত এপস্টিনের ‘পুরুষ ক্লাবে’ নারীদের কীভাবে দেখা হতো

মার্কিন বিচার বিভাগ কুখ্যাত শিশু যৌন নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টিনের যে লাখ লাখ ই–মেইল প্রকাশ করেছে, সেখান থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে একটি ই–মেইল বেছে নিয়েছিল দ্য গার্ডিয়ান।

ই–মেইলটি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক শনিবার সন্ধ্যায় লেখা, যেখানে জেফরি এপস্টিন তাঁর আয়োজন করা একটি ডিনারের অতিথি তালিকা মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সহকারীকে পাঠিয়েছেন।

ই–মেইলের শুরুতেই লেখা—‘বিলের জন্য যাঁরা।’ এরপর এপস্টিন লেখেন, সম্ভাব্য অতিথি: জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, চলচ্চিত্র পরিচালক উডি অ্যালেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী, হার্ভার্ডের দুজন শিক্ষাবিদ, হায়াৎ হোটেলের ধনকুবের সিইও, হোয়াইট হাউসের একজন যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

এপস্টিন ১০ জন প্রভাবশালী পুরুষের নাম নেন, তারপর লেখেন ‘অ্যান হ্যাথওয়ে (সত্যিই)’। অ্যান হ্যাথওয়ের নাম লিখে ব্রাকেটে ‘রিয়েলি’ বা ‘সত্যি’ শব্দটি লিখে এপস্টিন এটা স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন, তিনি মজা করছেন না।

কারণ, এপস্টিন যখন এই প্রস্তাব দেন, সে সময়ে একজন নারীও যে তাঁদের সঙ্গে ডিনারের টেবিলে বসতে পারেন, তা পুরুষদের কাছে খুবই অস্বাভাবিক বিষয় ছিল। এ কারণে একজন নারী থাকার বিষয়টির ওপর জোর দিতে গিয়ে এপস্টিন লিখতে বাধ্য হন—‘সত্যিই’।

জেফরি এপস্টিনের ম্যানহাটানের বাড়িতে হাতে আঁকা এই ছবি পাওয়া যায়। এখানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে নারীদের পোশাকে দেখা যাচ্ছে

অতিথি তালিকাটি খানিকটা অস্থিরভাবে শেষ হয়। এপস্টিন লেখেন, ‘ভিক্টোরিয়া সিক্রেট মডেলরা?’

এরপর এপস্টিন জিজ্ঞাসার সুরে লেখেন, ‘তালিকার ব্যক্তিদের মধ্যে কার সঙ্গে তিনি (বিল গেটস) সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাবেন বলে আপনি মনে করেন?’

এপস্টিনের এসব নথিতে পুরুষের আধিপত্য প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে এমন একটি জগতের চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে শুধু পুরুষেরাই ধনী ও ক্ষমতাশালী, নারীরা নন।

এপস্টিনের ই–মেইলগুলো সারা বিশ্বের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান পুরুষদের ব্যক্তিগত আচরণ প্রকাশ পেয়েছে—কীভাবে তাঁরা নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, মজা করেন এবং তথ্য বিনিময় করেন। তাঁদের এই জগতে নারীরা কোণঠাসা হয়ে থাকেন। ধনী এই পুরুষেরা নারীদের রাখেন শুধু তাঁর ব্যস্ত দিনের সূচি গুছিয়ে দেওয়ার জন্য, টেবিলে খাবার সাজাতে, টেবিলে উপস্থিত থেকে তাঁদের বিনোদন দিতে আর পুরুষের যৌনসঙ্গী হতে।

এপস্টিন বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, নারীরা কেন এখনো বুঝতে পারেন না যে তাঁরা পুরুষদের সঙ্গে একই টেবিলে বসার আশা করতে পারেন না। নারীদের নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে না এবং নারীদের সব সময় নাচার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

এপস্টিন তাঁর নেটওয়ার্কে থাকা এক পুরুষকে যে ধরনের ই–মেইল পাঠাতেন, সেগুলো সাধারণত এ রকম হতো—‘নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির প্রধান থরবজন ইয়াগল্যান্ড আমার সঙ্গে নিউইয়র্কে থাকবেন। হয়তো আপনার কাছে তাঁকে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।’

আর নারীদের পাঠানো ই–মেইলে এপস্টিন সাধারণ যৌনতাপূর্ণ কথা বলেছেন।

এপস্টিন–সংক্রান্ত এই বিশৃঙ্খল, বিস্তৃত ও কুৎসিত তথ্যভান্ডার নিয়ে যদি কেউ কয়েক দিন ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তবে তিনি বুঝতে পারবেন, কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আধুনিক বিশ্বকে শাসন করছে। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। তিনি দেখতে পাবেন, কীভাবে পুরুষেরা একে অন্যের প্রশংসা করেন, পরস্পরকে সুবিধা দিয়ে এবং মাঝেমধ্যে একে অন্যের জন্য কী করেছেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখেন।

নারীদের জন্যও এসব ফাইল আদতে অসাধারণ এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। পুরুষতান্ত্রিক ওই সব আলোচনা, যেখানে নারীরা জায়গা পান না, এসব আলোচনায় পুরুষেরা নারীদের সম্পর্কে কী ভাবেন ও কী বলেন, তা এপস্টিনের নথিতে অনেকটাই উঠে এসেছে।

এপস্টিনের ফাইলে দুই দল মানুষের কথা বলা আছে। তার একটি দল হলো, পুরুষ। এই পুরুষেরা ধনী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, নেতা—এমন মানুষ, যাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা লাভজনক। কারণ, তাঁদের মাধ্যমে এপস্টিন নিজের প্রভাবের জাল আরও শক্ত ও বিস্তৃত করতে পারতেন।

আরেকটি দল হলো নারীরা। এপস্টিনের কাছে নারীরা তুচ্ছ এবং শুধুই যৌন বা বিনোদনসঙ্গী। নারীদের তিনি অর্থের বিনিময়ে সেবা দেওয়ার জন্য রাখতেন। সেখানে নারীদের কেবলই বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এ কারণে এপস্টিন নারীদের দাঁত ঠিক করতে, ওজন কমাতে, যৌন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করাতে এবং মুখের আদল পরিবর্তন করতে বলতেন। যেমন ২০১৭ সালের জুলাইয়ে এপস্টিন একজন অজ্ঞাত নারীর কাছে লিখেছেন, ‘বয়স ২৩ হওয়ার আগেই নাকটা একটু ছোট করার জন্য চিকিৎসককে দেখাবে কী।’

এপস্টিনের পুরুষ অতিথিদের সেবা দিতে একদল নারী সহকারী থাকত। তাঁর দীর্ঘদিনের নির্বাহী সহকারী লেসলি গ্রফ মূলত এসব বিষয় দেখভাল করতেন। তিনি সূচি ঠিক করতেন, খাবারের আয়োজন করতেন এবং যৌনসঙ্গীর ব্যবস্থা করতেন।

২০১২ সালে ল্যারি সামার্সের সঙ্গে বৈঠক করেন এপস্টিন। ওই বৈঠক সামনে রেখে তাঁর দলে থাকা নারীদের গ্রফ বলেছিলেন, ‘ল্যারি একজন ভিআইপি। ল্যারির জন্য খাবার নিয়ে আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।’

এই ছবিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে একটি সুইমিংপুলে গিলেন ম্যাক্সওয়েল ও আরেক নারীকে দেখা যাচ্ছে

গ্রফ তাঁর দলে থাকা নারীদের পরে আবার মনে করিয়ে দেন, ‘আমরা কি ল্যারির জন্য হালকা কোনো খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছি?’

শুধু তা–ই নয়, গ্রফ অন্যান্য ধনী ও প্রভাবশালী পুরুষের নারী সহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। যেমন ইলন মাস্কের সহকারী মেরি বেথ ও অ্যান এবং ব্র্যানসনের সহকারী হেলেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে তাঁদের বসের পছন্দ-অপছন্দ জেনে নিতেন।

গ্রফ তাঁর বসের জন্য বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন, বৈঠকের সময় ঠিক করা, সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করার কাজও করতেন।

এপস্টিন–কাণ্ডে গ্রফও বিচারের মুখোমুখি হন। এর আগে তাঁর আইনজীবীরা বলেছিলেন, তাঁদের মক্কেলের চোখের সামনে কখনো কোনো অন্যায় বা বেআইনি কাজ হয়নি।

২০১৩ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে এক মঙ্গলবার সকালে আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম এপস্টিনকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে লেখা, ‘ইউক্রেনীয় ও মলদোভীয় [নারী] এসেছে। বড় হতাশাজনক বিষয় হলো মলদোভীয় নারী ছবির মতো আকর্ষণীয় নয়।’

এপস্টিন জবাবে লেখেন, ‘ফটোশপ।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ব্যবসায়ী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ‘ডিপিওয়ার্ল্ড’-এর চেয়ারম্যান। এই ‘ডিপিওয়ার্ল্ড’ নামের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তাদের সময়ে আর এই চুক্তি হচ্ছে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এপস্টিনের জবাবে সুলতান আহমেদ পাল্টা লেখেন, ‘ঠিক তা নয়, মলদোভীয় নারী খুবই খাটো আর চিকন।’

এপস্টিনের অন্তত ৫২৫টি বার্তায় নারীর যৌনাঙ্গের উল্লেখ আছে। পুরুষেরা এপস্টিনকে বার্তা পাঠিয়ে নতুন বছর বা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে বারবার নারীর যৌনাঙ্গের উল্লেখ করে কথা বলতেন।

এপস্টিনের অনেক বন্ধু তাঁকে ই–মেইলে যৌন সম্পর্ক স্থাপন স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো, সেসব নিয়ে কথা বলতেন। সেসব বার্তা অশ্লীল ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ।

এপস্টিনের ফাইলে নারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মজা করার অনেক উদাহরণও আছে। যেমন এপস্টিন কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কীভাবে গ্রেস ও মডেস্টি নামের দুই স্ট্রিপারের [যারা নগ্ন হয়ে নাচেন] সঙ্গে কারামুক্তি উদ্‌যাপন করেছেন, তা নিয়ে কথা বলেন। পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে সে কথোপকথন ছিল তাচ্ছিল্য আর কৌতুকে ভরা।

জেফরি এপস্টিনের নথিতে একদল তরুণীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ছবিও রয়েছে

ই–মেইলগুলোতে আরও দেখা গেছে, এপস্টিন প্রায়ই নারীদের নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করতেন।

এপস্টিন তাঁর জীবনে থাকা নারীদের সব সময় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন। তিনি এক নারীকে যৌন রোগের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং হরমোনের পরীক্ষা করাতে বলেন। তিনি নারীদের যৌন শিক্ষার ক্লাস করার পরামর্শ দিতেন।

অন্য একজন নারী তাঁর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। ওই নারী লিখেছেন, ‘আমি তোমার পছন্দমতো পোশাক পরেছি। আমি তোমার চাওয়ামতো চুলের স্টাইল করেছি। আমরা সহবাস করেছি। আমি তোমার জন্য বিরামহীন ম্যাসাজ করেছি। তোমার ও তোমার মেয়েদের সঙ্গে গোসল করেছি, যদিও আমি এটা পছন্দ করি না। আমি নেচেছি, যদিও নাচার সময় আমার মনমেজাজ ভালো ছিল না।’

এপস্টিন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিকার আচরণ নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। নিজের প্রেমিকার বিরুদ্ধে তিনি ‘ঘ্যানঘ্যান ও হাহাকার’ করার অভিযোগ করেছেন।

এপস্টিন লেখেন, তিনি ক্ষমতাশালী পুরুষদের সঙ্গে আয়োজন করা ডিনারে তাঁর প্রেমিকাকে অংশ নিতে দিচ্ছেন না বলে তিনি কান্নাকাটি ও হাহাকার করছেন।

এপস্টিন বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, নারীরা কেন এখনো বুঝতে পারেন না যে তাঁরা পুরুষের সঙ্গে একই টেবিলে বসার আশা করতে পারেন না। নারীদের নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে না এবং নারীদের সব সময় নাচার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।