ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

চূড়ান্ত বিবেচনায় বাংলাদেশ ও বাঙালি টিকে থাকবে

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর এবারের আয়োজনে অতিথি ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি শিক্ষক, নগর–পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদও। আরও নানা ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের বিচরণ। অগ্রগণ্য এই ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের জন্ম, শৈশব, পড়াশোনা, কর্মজীবনসহ জীবনের নানা অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন নজরুল ইসলাম।

প্রশ্ন

আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে। এ অনুষ্ঠানে আমরা জাতির অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী ও কৃতী মানুষদের কথা শুনি। আজ আমরা এসেছি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যারের কাছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। স্যার, আপনাকে ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাই।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

স্যার, আপনার তো অনেক পরিচয়—একটা আপনি শিক্ষক, দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন; আপনি ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশনে ছিলেন দীর্ঘদিন; আপনি নগর বিষয়ে, পরিবেশ, জলবায়ু ও আমাদের যে বাস্তুসংস্থান—এসব বিষয়ে আগ্রহী। আপনার কাজ, পরামর্শ, অবদান সবাই আমরা একবাক্যে স্বীকার করি। যখনই এ বিষয়ে জানতে হয়, আমরা প্রথম আলো থেকে আপনাকে ফোন করি বা আপনার কাছে আসি, আপনাকে নিয়ে যাই। এর বাইরে শিল্পকলা ইত্যাদি নিয়েও আপনার প্রচুর আগ্রহ। কিন্তু এ অনুষ্ঠানে আমরা সাধারণত জীবনের কাহিনি শুনি। আপনার ক্ষেত্রেও তা–ই শুরু করব। আপনার বয়স তো প্রায় ৮৬ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, সাতাশির দিকে আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনার জন্ম আসলে সার্টিফিকেটের বাইরে কত সালে, কত তারিখ, আপনি জানেন এটা?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমার জন্ম সেটাই তো প্রকৃত। জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৩৯। আর সার্টিফিকেটে হয়ে গেছে ’৪১, পয়লা মার্চ।

প্রশ্ন

’৩৯ হলে এই দিকে ৬০, এই দিকে ২৫—৮৬ বছর। ৮৬ পার। আপনার জন্ম কি শরীয়তপুরের গ্রামে?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: শরীয়তপুর, ভেদরগঞ্জ থানা, উপজেলা এখন। ভেদরগঞ্জের একটা প্রত্যন্ত জায়গা, চর। মেঘনার পাড়ে, আবার পদ্মার পাড়ে— দুইটার মধ্যবর্তী। আমরা ভূগোলের ভাষায় বলি ‘দোয়াব’, দুই নদীর মাঝখানে। তো এখন সেই ভেদরগঞ্জের চর। আমাদের পাশের থানা হলো ডামুড্যা।

প্রশ্ন

আর ওই চরটার নাম বা গ্রামটার নাম কী?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: গ্রামের নাম এটা নানা রকম হয়ে গেছে। আমরা ছোটবেলায় শুনতাম দিগর মহিষখালী। সংক্ষেপে নাম ছিল ডিএম খালি, ইংরেজি সংক্ষেপ। তো এখন এটার নাম বদলে–টদলে হয়েছে আরশীনগর।

প্রশ্ন

বাহ, বাহ! এত সুন্দর একটা নাম।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: হ্যাঁ, সুন্দর—আরশীনগর। আর আমরা এখন ভেদরগঞ্জ উপজেলার, কিন্তু প্রশাসনিক থানা হলো সখীপুর। একটা তো ঢাকার সখীপুর, আর এটা হলো আমাদের সখীপুর।

প্রশ্ন

হ্যাঁ, বাংলাদেশে একই নামে অনেক জায়গা আছে। যেমন সৈয়দপুর দুই জায়গায় আছে বা শেরপুর অনেক জায়গায় আছে। স্যার, আপনার আব্বা কী করতেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমার বাবা, আমরা বাবা বলি—আব্দুল কাদির। তাঁরা চার ভাই, দুই বোন। তিনি জ্যেষ্ঠ, চাঁদপুর গণি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। তারপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেছেন ১৯৩৫ সালে। এরপর উনি ফরিদপুর জজকোর্টে চাকরি নেন। এবং সেখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে...

প্রশ্ন

ওই সময়ে বিএ পাস তো অনেক বড় ব্যাপার।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: হ্যাঁ, তখনকার দিনে তো…আমাদের পুরো এলাকায় উনি দ্বিতীয় বিএ। প্রথম ছিলেন মাওলানা আবদুল্লাহ, আমাদেরই আত্মীয়।

প্রশ্ন

ওইটা তাহলে আপনাদের দাদার বাড়ি।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: দাদার বাড়ি। পৈতৃক, মানে পিতারও পিতা। তো এখন আসলে এ রকম—আমার জন্ম চরে, এই ডিএম খালিতে। আমার বাবার জন্ম চাঁদপুরে।

প্রশ্ন

এটা কি আমাদের কুমিল্লার পাশের চাঁদপুর?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: চাঁদপুরের পাশে যেখানে ফেরি, কী যেন এটার নাম? যাই হোক, চাঁদপুরে। কেননা আমার দাদার জন্ম হলো আবার মুন্সিগঞ্জের দীঘিরপাড়ে। তো দাদার বাড়ি জন্মসূত্রে বা তাঁর পিতা ইত্যাদি তাঁদের বংশনিবাস বিক্রমপুর দীঘিরপাড়ে। ওখান থেকে নদীভাঙনে ওনারা চলে গেলেন চাঁদপুর। চাঁদপুরে আবার নদীভাঙন। আমার বাবার জন্ম চাঁদপুরে। নদীভাঙনে আবার চলে আসলেন। আমরা আসলাম পশ্চিম দিকে, এটা ভেদরগঞ্জ চরে—ডিএম খালি চর। তো আমার জন্ম, আমার বড় ভাইয়ের জন্ম—আমাদের জন্ম এই চরেই।

প্রশ্ন

আব্বা তখন তো চাকরি করছেন।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: বাবা চাকরি করতেন প্রথমে জজকোর্টে। তারপর ঢাকায়, পাকিস্তান হওয়ার পর।

প্রশ্ন

কোন জজকোর্টে প্রথমে? চাঁদপুরের জজকোর্ট?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, না, ফরিদপুর। তারপর উনি চলে এলেন ঢাকায়।

প্রশ্ন

তো আপনার শৈশবের প্রাইমারি স্কুল কোথায় হলো?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমার জন্ম থেকে পাঁচ বা ছয় বছর আমরা গ্রামে ছিলাম। ১৯৪৫ সালের দিকে, আমার বাবা তো আগে থেকেই ফরিদপুরে ছিলেন। আমার মা, বড় ভাই, আমি, আমার ছোট ভাইবোন—সবাই চলে আসলাম ফরিদপুরে। ভেদরগঞ্জ থেকে ফরিদপুরে নৌকায় করে। আমার দাদা আমাদের নিয়ে আসলেন, মানে এখনকার ভাষায়—ফ্যামিলি মাইগ্রেশন। আমার বাবা তো আগেই গেছেন।

প্রশ্ন

ওই নৌকাগুলো তো গুণ দিয়ে টেনে নিয়ে যেত।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিরাট নৌকা। যেহেতু পুরো ফ্যামিলি, সংসারের যাবতীয় জিনিস নিয়ে ওই নৌকায় রান্নাবান্না, ঘুমানো। চার দিনের মতো লাগল। এই পদ্মা হয়ে তারপর ফরিদপুর, ওদিক দিয়ে গেলাম আরকি। তো এটা একটা অসাধারণ জার্নি বা ভ্রমণ। শরীয়তপুর থেকে ফরিদপুরের চরে। ভেদরগঞ্জ চর থেকে ফরিদপুরে যেতে সুরেশ্বর হয়ে তারপর পদ্মা নদী পার হয়ে চার দিন লাগল। চার দিন চার রাত—এ রকম। তো এটা আমার বিরাট একটা অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ছোট—পাঁচ-ছয় বছর বয়স। ফরিদপুরে ছিলাম ’৪৫ থেকে ’৫০। কিন্তু এর মাঝখানে আবার ১৯৪৯-৫০ সালে চলে গেলাম রাজবাড়ীর কালুখালীতে। কালুখালী একটা রেলওয়ে জংশন। আমার বাবা যখন ট্রান্সফার হয়ে ঢাকায় আসলেন, তখন তিনি বাড়িটাড়ি পাচ্ছিলেন না, তখন কিন্তু বাড়িঘর পাওয়া যেত না। ভাড়াও পাওয়া যেত না। তো পুরান ঢাকার ঠাঁটারীবাজার। আবুল হাসনাত—হ্যাঁ, সংবাদের এবং কালি ও কলমের। ওরা আমাদের পাশেই। মতিউর রহমানরা একটু দূরে, আধমাইলের মধ্যে পুরান ঢাকা। তার মানে আমার বাল্যকাল প্রথম পাঁচ-ছয় বছর গ্রামে। তারপর চার-পাঁচ বছর ফরিদপুরে। এর মধ্যে আবার দুই বছর কালুখালী ও রতনদিয়ায়। ওইখানে আমি স্কুলে প্রথম ক্লাস ফাইভে, পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এই আমার প্রথম স্কুল জীবন।

প্রশ্ন

ও তার আগে স্কুল ছিল না?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তার আগে স্কুলে যাওয়া-আসা করেছি তো বাড়িতেই। গ্রামে একবার গেছি পাঠশালায়। তারপর ফরিদপুরে এসে আলীপুরে থাকতাম। সেইখানে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম— ওইটাই শেষ। তারপর বাবা বদলি হয়ে গেলেন। আমরা আমাদের সেজ চাচা, যিনি সরকারি চাকরি করতেন—উনি বদলি হয়ে গেলেন কালুখালীতে। ওনার বিরাট সুন্দর বাংলো। সামনে চন্দনা নদী, পেছনে রতনদিয়া হাইস্কুল—একদম মাঠের পাশে। তো এখানে আমাদের কেটেছে বোধ হয় দুই বছর। ১৯৫০-এ পঞ্চম শ্রেণি পাস করলাম ওখান থেকে। ডিসেম্বর ১৯৫০, ঢাকায় চলে আসলাম।

প্রশ্ন

ঢাকায় এসে আপনি কোন স্কুলে ভর্তি হলেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: বাদামতলী নদীর ঘাটে একটা ছবি আছে শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের, এই সোয়ারীঘাটে। তো ঠাঁটারীবাজারে আমাদের বাসা। এখন তো কাপ্তান বাজার বলি আমরা, দুই নাম্বার কাপ্তান বাজার। আর বড় এলাকাটার নাম ঠাঁটারীবাজার। পাশেই নবাবপুর হাইস্কুল। তখন ’৫০-এর ডিসেম্বরে আসলাম তো, ৩০ ডিসেম্বর। জানুয়ারির এক-দুই তারিখে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য আমার চাচা আবদুর রাজ্জাক আর তার বন্ধু শিল্পী জয়নুল আবেদিনের বন্ধু আমাকে নিয়ে গেল ভর্তি করতে।

প্রশ্ন

চাচা আবদুর রাজ্জাক—উনি কি শিল্পী আবদুর রাজ্জাক?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: শিল্পী আবদুর রাজ্জাক আমার বাবার সবচেয়ে ছোট ভাই, আমার চাচা, ছোট চাচা। আমি ওনার খুবই ঘনিষ্ঠ ছোটবেলা থেকে। তো উনি আমার বাবার সাথে আমাদের বাড়িতেই থেকে পড়াশোনা করেছেন ইন্টারমিডিয়েট থেকে চারুকলা শেষ পর্যন্ত। তো ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম প্রিয়নাথ হাইস্কুলে। তখন প্রাইভেট চলছে না। আমি কোথাও জায়গা পাই নাই, বাড়ির কাছে এটা পেলাম। এটা তখন বলা যায় অচল। কারণ, একটা ক্রান্তিকালে ছিল ট্রানজিশন, সরকারি হবে। তো আমি ভর্তি হলাম প্রিয়নাথ হাইস্কুলে ১৯৫১ সালের জানুয়ারি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটা সরকারি হয়ে গেল। সরকারি নাম হলো নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান ছাত্র ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আমার পাঁচ বছর সিনিয়র। তো আমরা পাস করলাম ’৫৬ সালে ম্যাট্রিক, উনি ’৫১ সালে বোধ হয়। আপনাদের সম্পাদক মতিউর রহমান এই স্কুলের ছাত্র। ওঁর বড় ভাই আমার বন্ধু।

প্রশ্ন

তার মানে কিবরিয়া স্যার ওখানে ছিলেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: কিবরিয়া স্যার ছিলেন। আমাদের নবাবপুর স্কুল যখন সরকারি হতে শুরু হয়, তখন আগের শিক্ষক সব চলে গেলেন। বেশির ভাগ হিন্দু ছিলেন। একঝাঁক নতুন তরুণ শিক্ষক মূলত আসলেন। হেডমাস্টার ছিলেন বজলে কাদের। বজলে কাদের বিখ্যাত, হ্যাঁ, বিখ্যাত এবং খুবই অসাধারণ। ওই যে আমরা পড়ি না—ব্রিটিশ গ্রামার স্কুলের হেডমাস্টার, ওই রকম। একপর্যায়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ছিলেন কবি কাদের নওয়াজ। এ রকম ইলাস্ট্রিয়াস। আর শিক্ষক ছিলেন অনেকের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া, শিল্পী। সরাসরি উনি আমাদের ক্লাস সিক্স থেকে পড়ালেন, দুই বছর পড়াবার পর চারুকলায় চলে আসলেন। ওনার পর আসলেন আরেক শিল্পী বিখ্যাত মুর্তজা বশীর। তখনই ভালো নাম তাঁদের। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। তারপর আমি যখন বেরিয়ে আসব, ক্লাস টেনে বা ও–রকম, তখন গেলেন শিল্পী কাজী আব্দুল বাসেত। মানে আমরা ছেলেবেলায় তিনজন বিখ্যাত শিল্পীর ছাত্র হবার সুযোগ পেয়েছি। দুজনকে সরাসরি, একজন আমি আসার সময়।

প্রশ্ন

স্যার, আপনার রেজাল্ট তো খুব ভালো ছিল। আপনি সব সময় ক্লাসে ফার্স্ট হতেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: রেজাল্ট ভালো ছিল। ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবার সময় আমি ফার্স্ট হলাম এবং টাইটেল হয়ে গেল ফার্স্ট বয়। প্রতিটি ক্লাসেই একজন করে ফার্স্ট বয় থাকে। এই ফার্স্ট বয় ধারণাটা আমার মাথার মধ্যে এমনভাবে ঢোকা ঢুকেছে—এখনো এটা ধারণ করি যে আমি ফার্স্ট বয়। পরবর্তীকালে তো আর ওই রকম হয় নাই।

প্রশ্ন

স্যার, আপনার কি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন—এসব কথা কিছু মনে পড়ে?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: অবশ্যই মনে পড়ে। ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি, তখন আমরা জয়দেবপুরে বয় স্কাউট জাম্বুরিতে। ঢাকার সমস্ত স্কুলের ছেলেমেয়েরা ওইখানে। আমরা খবর পেলাম যে ওই রকম...তখন তো আমরা ছোট, ক্লাস সিক্সে পড়ি, সেভেনে পড়ি, বয়স আর কত! কিন্তু তার আগেও আমরা মিছিলটিছিলে যেতাম, ছেলেবেলায়। জয়দেবপুরে তখন তো আমাদের বয় স্কাউটদের রীতিমতো সকালবেলা পতাকা উত্তোলন হতো এবং সন্ধ্যাবেলা নামানো হতো। সেই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের পতাকা অর্ধনমিত করা হলো। তখন কমিশনার ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি সলিমুল্লাহ ফাহমি। ঢাকার কমিশনারও ছিলেন বোধ হয়। তিনি সকালবেলায় যে সমাবেশ, সেইখানে আমাদের অ্যাড্রেস করলেন এবং আমাদের ক্যাম্প শেষ করার আগেই ঢাকায় ফেরত নিয়ে আসা হলো। ট্রেনে জয়দেবপুর থেকে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে। সন্ধ্যাবেলা আমাদের একটা খোলা ট্রাকে করে প্রত্যেক বাচ্চাকে বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসা হলো। কারফিউ চলছিল। তো ওই ২১-এর দিন আমরা (ঢাকায়) নাই কিন্তু ওখান থেকে উপলব্ধি করেছি এবং শোক (পালন করেছি)। আর এর আগের স্মৃতিগুলো হলো ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শিল্পীরা পোস্টার লিখতেন। আমাদের কাপ্তান বাজারের বাসায় আবদুর রাজ্জাক, তাঁর বন্ধু রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর—এঁরা সব একসাথে কাজ করতেন, পোস্টার লিখতেন, আমরা দেখতাম। তখন তো কাজ হতো হালকা অর্ডিনারি খুব সাধারণ কাগজে—এটা আমার অভিজ্ঞতায় আছে। আমরা তো ছোট। তো তারপর ২১ ফেব্রুয়ারিতে…এটা আবার আমার দেখা নয়, শোনা। ওই যে বরকত—এঁরা যখন নিহত হলেন এবং মুর্তজা বশীর এঁদের একজনকে আহত অবস্থায় নিয়ে গেলেন হাসপাতালে; মুর্তজা বশীরের লেখাও আছে ‘রক্তাক্ত রুমাল’। আমার চাচা আব্দুর রাজ্জাক, মুর্তজা বশীরকে— আবার ডক্টর শহীদুল্লাহর ছেলে— তাঁকে মৌলভীবাজারে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসলো। এগুলো তো আবার কিছু শোনা, কিছু দেখা।

প্রশ্ন

ওইটা নিয়ে মুর্তজা বশীরের আঁকা ছবিও আছে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আঁকা ছবিও আছে, প্রিন্ট। বিখ্যাত এবং ওই যে ২১ ফেব্রুয়ারি হাসান হাফিজুর রহমানের বইটা। এখন আমার একটা হলো রাস্তার স্মৃতি। আরেকটা হলো এই শিল্পীদের আঁকা ছবির মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি—এটা মনে আছে। তারপর তো আমরা প্রতিবছর পালন করতাম। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ছোট টিনের বাক্সের মধ্যে পয়সা উঠাতাম, আর সেটা জমা দিতাম—এ রকম আরকি। শহীদ, একুশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি—এই আরকি!

প্রশ্ন

স্যার ম্যাট্রিক …তখন তো ম্যাট্রিক বলত স্যার?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ম্যাট্রিকুলেশন। ম্যাট্রিকুলেশন বলত ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন বোর্ড সারা বাংলাদেশে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ‘ঢাকা: সিটি টু মেগাসিটি’ বইয়ের প্রচ্ছদ
প্রশ্ন

এটা কত সালে পাস করলেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমরা পাস করলাম ১৯৫৬ সালে। তারপর ঢাকা কলেজ। আমার বাবাও পড়েছেন, আমার বড় ভাইও পড়েছেন।

প্রশ্ন

স্যার, তার মানে আপনার কি আর্টস ছিল? তখন কি সায়েন্স–আর্টসের ভাগ ছিল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমি আইএসসি সায়েন্স, ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স। ম্যাট্রিকে তো ভালো রেজাল্ট করে ফার্স্ট ডিভিশন করে আসলাম। আমাদের স্কুল থেকে ২৬ জন পরীক্ষা দিয়েছিলাম, ২৬ জনই পাস। আমরা চারজন ফার্স্ট ডিভিশন, আর বাকি সবাই সেকেন্ড ডিভিশন। তো ফার্স্ট ডিভিশনে আমি ছিলাম, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ছিল। নূরুদ্দিন ইঞ্জিনিয়ার, মাবুদ ইঞ্জিনিয়ার— বুয়েটের এঁরা ছিল। তো আমরা চারজন, আমরা চারজনই। নূরুদ্দিন নটর ডেমে গেল, আমরা তিনজন ঢাকা কলেজ। ’৫৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করলাম। স্কুলে তো ভালো ছাত্র ছিলাম। কলেজে গিয়ে একটু নড়বড়ে হয়ে গেলাম। ঠিকমতো ক্লাস করতাম না। অঙ্কের ক্লাস করতামই না। টিফিন আওয়ারের পর নিউমার্কেটে আড্ডা হতো—আমরা তিন–চার বন্ধু যেতাম। শেষে অঙ্ক পরীক্ষাই দিতে পারলাম না। তখনকার দিনে কড়াকড়ি ছিল। পারসেন্টজ না থাকলে নন–কলেজিয়েট, টাকা দিয়ে পাস। আমি হয়ে গেলাম ডিস-কলেজিয়েট, পরীক্ষায় দেওয়া গেল না। তার মানে ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিই নাই। তো ভাগ্য ভালো ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি।

প্রশ্ন

এটা মনে হয় ফোর্থ সাবজেক্ট ছিল। আমাদের সময় একটা বিষয় ছিল—ফোর্থ সাবজেক্ট।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তো আমি বুঝেশুনেই অঙ্কটা ফোর্থ সাবজেক্ট করেছিলাম, যাতে না দিলেও কিছু না হয়—এই আরকি।

প্রশ্ন

তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হলেন ভূগোল বিভাগে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ঢাকা কলেজ আমাদের জন্য ভালো ছিল, মানে কলেজের তো মাত্র দেড় বছর। হ্যাঁ, তখন অনেকে তো রাজনীতি করত, আমি এটা করতাম না। আমি লেখাপড়া আর আঁকাআঁকি।

প্রশ্ন

আপনি নিজেও ছবি আঁকেন।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ছবি আঁকি স্কুল থেকেই, আর কলেজে আঁকার চেয়ে বেশি লিখতাম। এবং আমি এটা খুবই গৌরবের মনে করি, ঢাকা কলেজ বার্ষিকীতে আমি দুটো লেখা দিলাম। যখন ছাপা হয়ে এলো, দেখলাম—দুটো লেখাই আমার ছাপা হয়েছে এবং প্রথমটাই আমার। সেটা আর্টের ওপর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর লেখা। বই পড়ে আরকি! তো আরেকটা ছিল ব্যক্তিগত প্রবন্ধ ‘একদা সন্ধ্যাবেলা’—মনে আছে এগুলো। আমাদের বন্ধুরা এটার সম্পাদক ছিলেন, পরবর্তীকালের খ্যাতিমান মানুষ মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ওই যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীটন্ত্রী হয়েছিলেন। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ভাই, ও কিন্তু খুব ভালো ছাত্রও ছিল এবং ভালো লেখালেখি…ও বোধ হয় ইন্টারমিডিয়েটে সেকেন্ড বা থার্ড হয়েছিল। ও পড়ত আর্টসে, আমরা সায়েন্সে। তো আমাদের সাথে ছিল বড় বড় পরবর্তীকালে বিখ্যাত লোকেরা— ব্যারিস্টার মইনুল; আমাদের বন্ধু জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

প্রশ্ন

গণস্বাস্থ্যের।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তারপর কাজী ফার্মসের কাজী জাহিদ হাসান আমাদের বন্ধু।

প্রশ্ন

জাহিদ ভাইয়ের এত বয়স নাকি?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: একই বয়স। আমরা খুব বন্ধু ছিলাম, বয় স্কাউট ছিল হোসেন কলেজিয়েট স্কুল, আমরা তখন ঢাকার সব স্কুলেরই—মানে ছাত্রসংখ্যা তখন কম—সবাই সবাইকে চিনতাম। একটা সুযোগ ছিল বয় স্কাউট যারা করতাম। আরেকটা সুযোগ ছিল খেলাধুলা যারা করে—এইভাবে আরকি। তবে কালচারাল অত বেশি হতো না।

প্রশ্ন

তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাদের পড়াতেন কারা?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওইখানে জিওগ্রাফিতে আমরা ভর্তি হলাম এবং জিওগ্রাফিতে তখন বিখ্যাত সব টিচার ছিলেন। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর নাফিস আহমেদ। তার আগে ছিলেন প্রফেসর রিজভী। উনি বদলি হয়ে চলে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে। নাফিস আহমেদ হলেন জওহরলাল নেহরুর বন্ধু সমসাময়িক আলীগড় থেকে করা সব জাঁদরেল স্কলার। ওনার বিখ্যাত বই হচ্ছে ‘ইকোনমিক জিওগ্রাফি অব ইস্ট পাকিস্তান’। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে করা। তো নাফিস আহমেদ এবং ওনার ওয়াইফ লুফে আহমেদ, রিজভী সাহেব ওনার ওয়াইফ বিলকিস রিজভী। এঁদের চারজন এবং এম আমিনুল ইসলাম তখন সিনিয়র লেকচারার। উনিও খুব বিখ্যাত। মানে তখন আমাদের টিচাররা খুব ইন্টারেস্টেড ছিলেন সাবজেক্টে। এবং ফিল্ড ওয়ার্ক ভূগোলের মূল কাজই হচ্ছে এক্সারসাইজ বা ফিল্ড ওয়ার্ক। প্রচুর ঘোরাতেন সারা বাংলাদেশে। তার মানে তখন থেকেই যখন জিওগ্রাফি পড়ছি, আমি একটা জিনিস চিন্তা করতাম—ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত আমি স্কুলে চারুকলা পড়েছি টিচারদের কাছে এবং আমার চাচার কাছে। তার চারুকলার প্রভাবটা আমার জিওগ্রাফিতে খুব কাজ করল। জিওগ্রাফিতে যে স্কেচিং, ম্যাপিং, ড্রয়িং—এটা আমার কাছে খুব সহজ ছিল। ফলে আমার জিওগ্রাফি, তখন থেকেই আমি খুব প্যাশনেটলি ভূগোলে কাজ করতে লাগলাম। ’৫৯ থেকে ’৬১ বা ’৬২ –তে পাস করলাম মাস্টার্স। ওই বছরই আমি রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করলাম ওনাদের একটা প্রজেক্টে। রিভার ফ্লাড ভলান্টিয়ার্স বা এ রকম একটা জিনিস। নদী নিয়ে কাজ—রিভার ফ্লাড স্টাডি। তো ওইখানে আমার কাজ হলো ম্যাপ তৈরি করা বা অ্যানালাইসিস করা। তো তখন থেকে আমার ওই ভূগোলে নেশাটা ঢুকে গেল এবং পরবর্তীকালে ১৯৬৩–তে আমি প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই ভূগোল বিভাগে। এই শুরু হলো আমার শিক্ষকতা। একই সাথে পড়াশোনা করার জন্য বাইরে যাওয়া, পিএইচডি ইত্যাদি। তো আমার পিএইচডির বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং। আমি জিওগ্রাফি থেকে সরে আর্কিটেকচার বা প্ল্যানিংয়ে গেলাম। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে আমি জিওগ্রাফি বিভাগে ভর্তি হলাম। কিন্তু আমার রিসার্চের বিষয় ছিল হাউজিং অ্যান্ড আরবান প্ল্যানিং। পরবর্তীকালে আমার কাজের এলাকা হয়েছে যে আরবান স্টাডিজ বা নগর–পরিকল্পনা। এবং এইখানে আমি আমার সারা জীবনের একটা বড় কাজ হলো সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ (সিইউএস) প্রতিষ্ঠা করা ১৯৭২ সালে। মানে স্বাধীনতার পরপরই। আমি দেখলাম—বাংলাদেশে নগরায়ণ খুব দ্রুত হচ্ছে এবং শহরগুলো খুব বিশৃঙ্খলভাবে বাড়ছে। তো এটার জন্য একটা রিসার্চ ইনস্টিটিউট দরকার। তখন আমাদের সঙ্গে ছিল অনেক ভালো ভালো ছাত্র। তারা এই কাজটা করল। তখন থেকে এ পর্যন্ত গত ৫০ বছর আমরা শহর নিয়ে কাজ করছি। এবং বিশেষ করে নিম্নবিত্তের মানুষের বাসস্থান বা বস্তি—এগুলো নিয়ে কাজ করছি।

প্রশ্ন

’৫৮ সনে আপনি ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে। আপনার এই ভর্তি হওয়ার বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমি তো ’৫৮ সনে ভর্তি হলাম। তো আমার ভর্তিটা আবার ইন্টারেস্টিং। আমি পরীক্ষায় পাস করার পরে, রেজাল্ট দেখার পরে…খুব ভালো হয় নাই, ফার্স্ট ডিভিশন। ইরানে গেলাম, তেহরান। বয়স্কাউট জাম্বুরি। এটা আন্তর্জাতিক জাম্বুরি ইরানিয়ানরা ব্যবস্থা করেছে। তো পাকিস্তান থেকে গেল ৫০ জন। পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৮ জন, পূর্ব পাকিস্তানের ২ জন। একজন আমি, আরেকজন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের একটা ছেলে। সে আবার অবাঙালি। তার মানে বাঙালি একজনই, আমি। তো আমি তখন অ্যাকটিভ বয়স্কাউট না, আমি তো পাস করে গেছি। ওই লেখালেখি করতাম। একটা ম্যাগাজিন ছিল, পাকিস্তান থেকে বেরোত—‘পাক স্কাউট’। আমি প্রতি মাসে লিখতাম ইংরেজিতে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
প্রশ্ন

একটা কথা বলি স্যার, এই জিনিসটা তরুণ প্রজন্মকে একটু বোঝানো কঠিন যে পাকিস্তান যদি থাকত, তাহলে এই রকমই আমাদের প্রপোরশনটা হতো যে দুই পাকিস্তান থেকে একটা আন্তর্জাতিক স্কাউট সম্মেলনে ৫০ জন যাচ্ছে, বাঙালি মাত্র একজন। এই যে বৈষম্য ছিল, এই যে বঞ্চনা ছিল...

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, দুজনই ধরি, সে–ও বাংলাদেশের—পূর্ব পাকিস্তানের। মাত্র দুজন।

প্রশ্ন

পূর্ব বাংলা থেকে মাত্র দুজন, তার মধ্যে একজন বাঙালি, একজন উর্দু স্পিকিং। ঠিক আছে। এরপর স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও স্মৃতি বলেন। আপনি যেটা বলছিলেন, ইরানের কথা যদি আরও কিছু বলতে চান...

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওই জাম্বুরিতে থাকার পর যখন ফিরে আসি, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ। কিন্তু আমি এসে দেখি, আমার বড় ভাই যিনি ডাক্তারি পড়তেন, আমাকে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করিয়েছেন। তখন ওই যে ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিশন, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ডিভিশন, ইংরেজির নম্বর ভালো—কোনো অসুবিধা হয় নাই ভর্তিতে। ডক্টর সাজ্জাদ হোসেন চেয়ারম্যান, হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট, নিয়ে নিলেন। তো আমি এসে দেখলাম যে ইংরেজিতে সুবিধা হবে না। আমি হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্টের কাছে গেলাম। দেখা করলাম। বললাম, স্যার, আমি তো ইংরেজি পড়তে চাই না, পারব না। (স্যার বললেন), কেন পারবে না? কী রেজাল্ট তোমার? (বললাম) এই…এই। (স্যার বললেন), পারবে না কেন? অনেক ছাত্র আছে, সায়েন্স পাস করে আমার এখানে এসেছে, খুব ভালো ছাত্র।

যা–ই হোক। তো (স্যার বললেন) ক্লাস করো, ভালো না লাগলে পরে চলে যেয়ো। তো আমি এক মাস ক্লাস করলাম, ভালো লাগল না। দেখলাম যে এখানে আমি সুবিধা করতে পারব না—সোজা কথা। তারপর ভূগোলে আমি খুব ভালো, স্কুল থেকেই, কলেজেও। তো ওখানে গেলাম। প্রফেসর নাফিস আহমেদ, চেয়ারম্যান। তো হ্যাঁ চলে আসো। আমরা ফার্স্ট ডিভিশন। আমরা ১৪ জন বোধ হয় ভর্তি হলাম। তার মধ্যে ৪ জন ফার্স্ট ডিভিশন। তার মধ্যে আমি একজন।

প্রশ্ন

ফার্স্ট ক্লাস?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, তখন ফার্স্ট ডিভিশনই বলত। আমরা ভর্তি হলাম ১৪ জন। ১৪ জনের মধ্যে আমি দেখলাম খোঁজ নিয়ে, আমি ফার্স্ট ডিভিশন, প্রফেসর রোজী এম আহসান, পরে প্রফেসর, উনি, আরও দুজন— মুস্তাফিজুর রহমান পরে যিনি পররাষ্ট্র সচিব হলেন, ওই যে কাঠমান্ডু থেকে প্রথম বাংলাদেশি ডিপ্লোম্যাট যে (পক্ষত্যাগ) করল… স্বাধীনতার পক্ষে। ও আমাদের সহপাঠী। তো আমরা ভর্তি হলাম…প্রফেসর নাফিস আহমেদ, অবাঙালি ইউপির লোক। আমাদের সিনিয়র টিচার সবাই অবাঙালি। নাফিস আহমেদ, এফ করিম খান, প্রফেসর রিজভী, প্রফেসর নাগবি—এঁরা সবাই অবাঙালি, সিনিয়র। কারণ, বাংলাদেশে তো জিওগ্রাফি ছিল না। কলকাতায় ছিল একটু। আমি তো ভর্তি হলাম ’৫৮ সনে। প্রফেসর নাফিস আহমেদ তখনই কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান ভূগোলবিদ। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি, তাঁর প্রফেসর ছিলেন ডডলি স্ট্যাম্প—জগদ্বিখ্যাত লোক। জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট শুরু হয়েছে ’৪৮ সনে—প্রথম থেকেই উনি হেড। তো নাফিস আহমেদ, ছোটখাটো মানুষ … তো খুব স্মার্ট। তাঁর স্ত্রী ছিলেন আবার বাঙালি, কুমিল্লার নবাববাড়ির মেয়ে। তো উনি বাংলা ঠিক শেখেন নাই, ওনার স্ত্রী বাংলা বলেন, উনি উর্দু বলেন, ইংরেজি বলেন। তারপর প্রফেসর রিজভী, ডক্টর রিজভী, তারপর নাগবি—এঁরা সব উর্দু বলেন, ইংরেজি বলেন, বাংলা বলেন না। চেষ্টাও করতেন না। কিন্তু মানুষ খুব ভালো। রিজভী সাহেব আবার বিয়ে করেছিলেন আমাদের এক বড় আপা জিওগ্রাফির খুব ব্রিলিয়ান্ট নাজমা রিজভীকে। পরবর্তীকালের খুব বিখ্যাত নুরুল ইসলাম শিশু, মন্ত্রী, তাঁর বড় বোন। তো ওনারও এক ভাই, বোধ হয় ওর নাম আনিস ইঞ্জিনিয়ার। যা–ই হোক, তো রিজভী সাহেব বাংলা বলতেন না, কিন্তু আমাদের খুব ভালোবাসতেন। তো ঠিক আছে। বাঙালি টিচার আমরা পেলাম লেকচারার, প্রফেসর—পরবর্তীকালে খ্যাতিমান প্রফেসর আমিনুল ইসলাম, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর লুতফুল হক—এঁরা এবং আরেকজনকে পেলাম সর্বকালীন প্রফেসর তখন, লেকচারার হারুনুর রশিদ—সিএসপি হলেন, পরে যে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন, পরিবেশ নিয়ে প্রচুর কাজ…যা–ই হোক। এঁরা আমি বলব, প্রত্যেকেই অসাধারণ। আমি বিশেষভাবে মনে রাখি নাফিস আহমেদকে, অবশ্যই আর এফ করিম খান ফজলে করিম খান…উনি অবাঙালি বিহারি, বাকিরা সব ইউপি। এই ইউপির লোক আবার এই বিহারিকে পছন্দ করত না। একটু খাটো মনে করত। ফজলে করিম খান ছিলেন আমার এমএ থিসিস সুপারভাইজার। অসাধারণ লোক।

প্রশ্ন

এমএ থিসিস কী নিয়ে করলেন স্যার?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ঢাকার হাই ক্লাস রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, উচ্চবিত্ত এলাকা।

প্রশ্ন

এটা ’৬১ সালের দিকে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আমি ওইটা করলাম ’৬১–৬২ সালে।

প্রশ্ন

তখন হাই ক্লাস এরিয়া কোনটা ছিল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এই ধানমন্ডি, পরিকল্পিত ধানমন্ডি, রমনা এবং নির্মীয়মাণ গুলশান–বনানী। তো এটা আমার এমএ থিসিস। এটা আমার সবচেয়ে ভালো প্রিয় কাজ। আমার এই প্রথম এমএ থিসিস যেটা, হাই ক্লাস রেসিডেন্সিয়াল এরিয়াজ ইন ঢাকা সিটি ফ্রম ১৬০৮ টু ১৯৬২…। এটা আমি অনেকগুলো সূত্র থেকে, মানচিত্র, ডকুমেন্ট বই, এটা–সেটা দেখে এই প্রাচীনকালের মানচিত্রগুলো তৈরি করলাম। বৃত্তভিত্তিক। আমরা বলি ল্যান্ড ইউজ ম্যাপ। রেসিডেন্সিয়াল কমার্শিয়াল ইন্ডাস্ট্রিয়াল এইটা চিহ্নিত করা ম্যাপিং।

ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ‘ঢাকা: এখন ও আগামীতে’ বইয়ের প্রচ্ছদ
প্রশ্ন

১৭ শতক থেকে এসে ২০ শতক, না ১৯৬০-৬২। তো ঢাকার এই উচ্চবিত্তরা তাদের আবাস এলাকাটা কীভাবে, কোত্থেকে শুরু করে? এটা কি বুড়িগঙ্গা নদীর ধার থেকে আস্তে আস্তে এই উত্তর দিকে সরতে শুরু করল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: সেই বুড়িগঙ্গা নদী মানে নবাববাড়ি। তার আগে মোগলরা ছিল যখন, মোগলদের সময় ছিল চকবাজার চক এলাকা এবং তাদের রাজা–বাদশাহ, লালবাগ ইত্যাদি। আর তারও আগে, মোগলদেরও আগে মোগলরা তো এল ১৬০৮ বা ’১০, তারও আগে ঢাকা শহর ছিল। এবং খুব ইন্টারেস্টিং, যেখানে আদি ঢাকা, তার নাম এখন বাংলাবাজার। কীভাবে হয়ে গেল? ঢাকার আদি কেন্দ্র হলো বর্তমান বাংলাবাজার। বহুদিন থেকে বাংলাবাজার। এটা আমি একটা বলি যে একটা মানে ঘটনা। বাংলাদেশে আর আছে কোথায়? বাঙালি নদী বগুড়ার ওদিকে। বাঙালি বলতে এই দুইটাই আছে বাংলাবাজার ভৌগোলিকভাবে বাঙালি নদী। তো যা–ই হোক, ওই সদরঘাট এলাকা, প্রথমে চকবাজার, তারপর ঢাকা। শুরুটাই তো হলো বুড়িগঙ্গা দিয়ে। বুড়িগঙ্গা দেখেই ইসলাম খান—এঁরা ঠিক করলেন যে এইখানে হবে যাতায়াতের সুবিধা; আর ওই পর্তুগিজ বর্গীদের ঠেকানো। তো ওইখান থেকে শুরু মোগল আমলে, এখন যেটাকে পুরান ঢাকা বলি; এই লালবাগ, তারপর ইসলামপুর—এই সমস্ত জায়গা, বাংলাবাজার ইত্যাদি।

প্রশ্ন

আপনি যখন ঢাকায় এসেছেন, তখন তো ওয়ারী উচ্চমধ্যবিত্ত এলাকা, পরিকল্পিত।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওয়ারী তখন উচ্চমধ্যবিত্ত এলাকা, পরিকল্পিত এবং অনেকটা প্রাইভেট। খুব সুন্দর একটা জায়গা। এই যেটা বলেন না, প্ল্যানিংয়ে গ্রিড প্যাটার্ন, সোজাসুজি রাস্তা; আগে ছিল আঁকাবাঁকা রাস্তা। ওয়ারী আর গেন্ডারিয়া—এই দুটো হলো প্রথম গ্রিড প্যাটার্ন এবং ওয়ারীর পরপরই রমনা। রমনা আবার খুব সুন্দর মিক্স, এটা ব্রিটিশ প্ল্যান। ওয়ারীও ব্রিটিশ আমলে, বুদ্ধদেব বসুর লেখার মধ্যে আছে।

প্রশ্ন

বুদ্ধদেব বসুর লেখার মধ্যে আছে। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে প্রথম উদ্যান নগরী হচ্ছে ঢাকা, যেটা রমনাকেন্দ্রিক ব্রিটিশরা আর্কিটেক্ট নিয়ে এসে...

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: বুদ্ধদেব বসুর লেখায় আছে, পুরানা পল্টন। বুদ্ধদেব বসু তো থাকতেন পুরানা পল্টনে। তখন খোলামেলা, তাঁর লেখায় আছে না, বারান্দায় বসে বিস্তীর্ণ দক্ষিণ দেখা যায় একবারে—এখন যেটা রেললাইন। তো ব্রিটিশ আমলের রমনা, এখন যেটা রমনা এবং এখন যেটা নীলক্ষেত—এই দুটো মিলিয়ে ছিল মাঝখানের রেসকোর্স ময়দান। খুব সুন্দর প্ল্যান—আমার মতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দর। কিছু সোজা রাস্তা, আবার কী সুন্দর একটা বাঁকা রাস্তা—ওই যে চিফ জাস্টিসের বাড়ির পাশ দিয়ে। আরেকটু পাশেই হলো লেক, জলাশয়। সবুজ ও জল, এই দুটোকে মিলিয়ে চমৎকার। আর গাছ, এত চমৎকার সব গাছ লাগিয়েছে, এখনো ১৫০ বছরের পুরোনো গাছ সব টিকে আছে।

প্রশ্ন

গগনশিরীষ, সব রেইনট্রি, বড় বড় গাছ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: রমনা, নীলক্ষেত—সব একেকটা রাস্তায় একেক ধরনের গাছ।

প্রশ্ন

স্যার, ঢাকা মেডিকেল কলেজের এখন যে বিল্ডিং, ইমারজেন্সি যে ইয়েগুলি, ওগুলি আগে থেকেই কি? এটা কিসের জন্য বানানো হয়েছিল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এইটা তো তখন সেক্রেটারিয়েট। বলে না সেক্রেটারিয়েট রোড—এইটা ওই রকম। এটা চলে গেছে আমাদের এশিয়াটিক সোসাইটির পাশ দিয়ে নিমতলীর ওইখান দিয়ে।

প্রশ্ন

ওই রাস্তাগুলো, ওই বিল্ডিংগুলো এত সুন্দর গাছটাছ মিলে, যদিও গাছগুলো আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারপরও এখনো আমার মনে হয়, ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা হচ্ছে এই শাহবাগের শেরাটন বা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের পাশ দিয়ে ওই যে সুগন্ধার পাশ দিয়ে প্রধান বিচারপতির বাড়ির যে রাস্তাটা, ওইটা ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: খুব সুন্দর আরেকটা; ওই ধরনেরই ছোট এলাকা হলো আমাদের ইউনিভার্সিটির ভেতর দিয়ে ফুলার রোড।

প্রশ্ন

ফুলার রোড। ওইটাও খুব সুন্দর।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ফুলার রোডে যেমন অধ্যাপক ফকরুল আলম থাকতেন, তো ওখানে আমিও থাকতাম। উনি একটা লেখা লিখেছেন ওই ফুলার রোড নিয়ে। যা–ই হোক, আমাদের সময়ে আমরা তো স্কুল–কলেজ পর্যন্ত শুধু হাঁটতাম—তখন তো আমরা কিশোর।

প্রশ্ন

আপনাদের সময়ে ঢাকা কলেজের বিল্ডিং কোনটা ছিল? ঢাকা কলেজ কোথায় ছিল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ঢাকা কলেজ ছিল—আমাদের সময়ে তৈরি হয়ে গেছে—নিউমার্কেটের পাশে এখনকারটা। তার আগে আমার বড় ভাই পড়েছেন যখন, তখন তাঁদের বিল্ডিংই ছিল না, ফুলবাড়িয়া। পুরোনো বাড়িঘর নিয়ে, তখন ছিল না। অরিজিনাল ঢাকা কলেজ তো বর্তমান হাইকোর্ট। আমার বাবা পড়েছেন পুরোনো হাইকোর্টে। তিনি চাকরিও করেছেন আবার হাইকোর্টে। তো এখন ওইটা আবার গভর্নমেন্ট হাউসও বলে—গভর্নরস প্যালেস। হাইকোর্ট বিল্ডিং, কার্জন হল, একই সময়ের।

প্রশ্ন

এটা ১৯০৫–এর পরে হয়।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ১৯০৫–এর পরে। হাইকোর্ট তো ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ঢাকার হাইকোর্ট। আর কার্জন হলটা আবার মোগল আর্কিটেকচার ও ব্রিটিশ কম্বাইন করে। সুন্দর, খুব সুন্দর, অসাধারণ! আমার সবচেয়ে প্রিয় বিল্ডিং। আমরা তো ওইখানে পড়েছি, পরীক্ষা দিয়েছি ওখানে।

প্রশ্ন

আমি একটা জিনিস বলি, ব্রিটিশরা যে রমনা, তারপর নীলক্ষেত, হাইকোর্ট, এস এম হল, কার্জন হল—এগুলো বানিয়ে দিয়ে গেল, ওই এলাকাটা তারা গড়েছে, কত সুন্দর একটা শহর। তারা যখনই কোনো একটা ধরে, রেললাইনই বানায়, একটা রোড বানায়, দুই পাশে প্রচুর জায়গা রেখেছে। আমাদের রংপুর জিলা স্কুল বিশাল বড়, রংপুর কারমাইকেল কলেজ বিশাল বড়। তারপর এখন আমরা, তারপর আইয়ুব খানের আমলে আমাদের যে শেরেবাংলা নগরটা হলো, তখন আইয়ুবনগর ছিল, এটাও খুব সুন্দর।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: অসাধারণ, খুব সুন্দর।

প্রশ্ন

এই লুই কানের যে অসাধারণ...

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: অসাধারণ, আমি আসব, একটু সুযোগ পেলে বলব।

প্রশ্ন

হ্যাঁ, আমরা আসব। তো সেই তুলনায় স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা ভালো কিছু করি নাই। একমাত্র আমি দেখলাম যে হাতিরঝিল, সেটাও তো আমরা মেইনটেইন করতে পারছি না।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: সেটা অন্য জিনিস। কিন্তু করেছিল ভালো। না, এটাই ব্রিটিশ আমলের। এই যে রমনা, নীলক্ষেত—এগুলো করেছে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, এই যে রমনা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের বাংলো ছিল। এগুলো পরে সরকারি বাংলো হয়ে গেল। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছিল কত, ৬৫০ একর।

প্রশ্ন

এই মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়া যেটা, এগুলো সব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের...

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের। ৬৫০ একর এখন সেটা নেমে এসেছে ২২৫ একরে বা ২৫০ একরে। তিন ভাগের এক ভাগ এতটুকু। তখন তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বাংলোগুলো এখন একমাত্র আছে ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের বাড়িটা। এটা সংরক্ষিত।

প্রশ্ন

চামেরি হাউসও তো ছিল স্যার।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: চামেরি ওগুলো লাল বাড়ি সব। এগুলো সব এই যে এখন যেটা ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাঠ, তার উল্টো দিকে ছিল প্রফেসরদের বাড়ি। সত্যেন বোস—এঁরা থাকতেন। তো এখন সব বাংলোই তো ভেঙে ফেলা হয়েছে। একটা বাংলো ছিল, যেটা আমি যে ফুলার রোডে থাকতাম, আমার ঠিক সামনে, এইটাই সর্বশেষ বাংলো। এখানে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় অধ্যাপক, তিনি থাকতেন এবং তাঁর সাথে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আবুল খায়ের লিটু, ওঁরা থাকতেন। এইটাই শেষ বাংলো। চামেরি হাউস আর ওদিকে হলো কী এটার নাম এখন, সিরডাপ—ওইটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটা খুব ভালো যে অন্তত আমাদের উপাচার্যের ভবনটাকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে এটা সাদা বিল্ডিং, লাল বিল্ডিংগুলো একটাও নাই। লাল ইটের বিল্ডিং, সেগুলো নাই। তো যা–ই হোক...

ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
প্রশ্ন

স্যার, আপনার জীবনের মধ্যে আসি আবার। আপনি এমএ পাস করলেন ১৯৬২ সালে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ’৬২।

প্রশ্ন

অবশ্যই ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন, নাকি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আমি অনার্সে জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের অল টাইম রেকর্ড ব্রেকিং।

প্রশ্ন

আচ্ছা, তারপর কি আপনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন, নাকি অন্য কোনো চাকরি করেছেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, এটা একটু দুঃখের গল্প আরকি! আমি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, এমএতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ডিভিশন, ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিশন—এ রকম রেজাল্ট কারও ছিল না, আমিই প্রথম। কিন্তু আমাকে চাকরি দিল না লেকচারারের। তো পাস করার পরপরই আমি চাকরি করলাম, পার্টটাইম বাংলা বিশ্বকোষ প্রজেক্ট ছিল…একটা ফ্র্যাঙ্কলিন। এটা চার ভলিউমে বিশ্বকোষ বের হয়, তখন ওইখানে আমরা ছাত্ররা কাজ করতাম। একটা শব্দ লিখলে ৫০ পয়সা, যা–ই হোক, ওটা আছে আমার কালেকশনে। তো এখানে পার্টটাইম করতাম আর প্রাইভেট টিউশনি করতাম। তারপর যখন সুযোগ হলো, কী বলে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট হলো লেকচারারের, আমি তো শিওর, হবই; কিন্তু আমাকে নিল না। এই যে বৈষম্যের কথা বলি, তখন এই বৈষম্যের আমিও শিকার। আমার হেড অব ডিপার্টমেন্ট নাফিস আহমেদ অবাঙালি—আমি একটু বেশি বাঙালি, সাধারণ বাঙালি পছন্দ নয়। একটু অভিজাত বাঙালি অমুক সিভিল সার্ভেন্টের ছেলে বা অমুকের ছেলে হলে ঠিক আছে, মেয়ে হলে আরও ভালো। তো আমাকে নিল না প্রথম দফায়, আমাকে লেকচারার সুযোগ দিল না। একজন অবাঙালি বয়স্ক লেকচারার কক্সবাজার থেকে নিয়ে এল। তাঁকে দিল, যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত আসেন নাই। আমাকে ঠেকাবার জন্য আমি যেন না পেয়ে অন্য জায়গায় চলে যাই; যা–ই হোক, আমি কলেজে পেয়েছিলাম, আমি যাইনি। তারপরে ভাইস চ্যান্সেলর চেঞ্জ হয়ে গেল, তখন অবাঙালি ভাইস চ্যান্সেলর মাহমুদ হাসান খুব ভালো লোক, কিন্তু নাফিস আহমেদ যা বলেছেন, হেড, তিনি তা–ই করলেন, নিলেন না। তারপর চেঞ্জ হলো। প্রফেসর ডক্টর ওসমান গনি ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে এলেন। তখন ওনার বড় ছেলে ওসমান ফারুক, পরে শিক্ষামন্ত্রী ও আমার কলেজ ফ্রেন্ড, ও বলে, দেখি আমি, দেখি। বাবাকে বলি। তো বলল, ফাইল আনো, কী হলো, কেন আসে নাই, আসে নাই তো নজরুল ইসলাম, কেন হলো না। আচ্ছা আবার অ্যাডভার্টাইজ করো, তো আবার পেলাম। ওই যে বাঙালি–অবাঙালি বৈষম্যের আমি শিকার।

প্রশ্ন

তাহলে যোগ দিলেন কত সালে ’৬৩–৬৪?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা ’৬৩। আমার রেজাল্ট হতে হতে ’৬৩–র প্রথম দিকে এবং ভ্যাকেন্সি হতে হতে মাঝামাঝি। তো আমি জয়েন করলাম শেষে সেপ্টেম্বর ৬ তারিখ ১৯৬৩।

প্রশ্ন

তারপর স্যার আপনি উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত গিয়েছিলেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: কানাডায়। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ। আমি তো সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, বাবাও সাধারণ। তো ফ্যামিলি পরিচয় ও রকম নয়। তো ইউনিভার্সিটিতে হলো না। ঢাকা কলেজে পরীক্ষা দিতে, মানে যখন কলেজশিক্ষক হিসেবে গভমেন্ট কলেজে দিলাম, সেখানেও নাফিস আহমেদ সাহেব বোর্ডে আছেন এবং আমাকে বাদ দিতে চাইলেন। তো বাদ দিতে পারেনি আমাকে, পোস্ট দিল। কমনওয়েলথ স্কলারশিপে যখন আমি ইন্টারভিউ দিলাম, তখনো তিনি আছেন এবং আমাকে বাদ দিবেন। বলেন, না, ও থাকবে না, ও টিচিংয়ে থাকবে না। ও সিভিল সার্ভিস দেবে। সবাই দেয়, ও দেবে, চলে যাবে। কিন্তু ওনারা আমাকে দিল। আমাদের জিওগ্রাফি থেকে আমরা তিনজন সিলেকশন পেলাম, যেখানে একজনও পায় না। আমি কানাডা। আমার ক্লাসমেট রোজী এম আহসান, উনি পেলেন ইউকে। উনি বরং প্রেফারেন্স পেলেন বেশি। আর একজন, যিনি সেকেন্ড ক্লাস অবাঙালি, তাঁকে দিল। আমার এক বছর সিনিয়র, কিন্তু সেকেন্ড ক্লাস, তাঁকে দিল কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নাইজেরিয়া। নাইজেরিয়া ইবাদান ইউনিভার্সিটি। নাইজেরিয়ার উচ্চশিক্ষা কিন্তু তখন থেকেই খুব ভালো।

প্রশ্ন

পিএইচডি প্রোগ্রাম ছিল?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: সরাসরি পিএইচডি।

প্রশ্ন

না করে চলে এলেন কেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা আমারই দুর্বলতা বা আহাম্মকি আরকি! অন্যদিকে বেশি নজর...

প্রশ্ন

নাকি অনেক সময় বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেলে দেশের টান হয়?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, ওটাও কিছুটা। ওটা একটা কাহিনি, ওটা বড় কাহিনি। তো সেটা হলো যে আমরা গেলাম কানাডায় পিএইচডি ডিরেক্ট। আমাদের তো ১৬ বছরের এমএ। অন্য জায়গায় তো ১৭ বছরে হয়। তো ১৬ বছরের এমএ নিয়ে আমি গেলাম।

প্রশ্ন

১৬ বছরের এমএ মানে বুঝিনি।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এমএ করতে ১৬ বছর লাগল। ম্যাট্রিকে ১০, ইন্টারমিডিয়েটে ২, অনার্স–এমএতে ৪। ১৬ এখন তো ১৭। তো আমরা, তার মানে আমার এমএ ইকুইভ্যালেন্ট টু বিএ ইন হংকং ইউকে অর কানাডা। তো এক বছর কম তা–ও। তো প্রথমে গেল পরেই আমাদের এই গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট এমএ পিএইচডি সবার একটা কম্প্রিহেনসিভ টেস্ট নিল। কয়েক ঘণ্টার, তিন ঘণ্টার বোধ হয়। তো আমি পাস করলাম, বলল তোমার আর কিচ্ছু করতে হবে না। তোমার কোনো কোর্সও নিতে হবে না। তুমি ইচ্ছা করলে নেও, সেমিনার কোর্স নেও, যেখানে পরীক্ষা–টরীক্ষা নাই। তার মানে একটা ভালো মূল্যায়ন হলো এবং সুযোগ পেলাম। তো শুরু করলাম। তো আমার সুপারভাইজার হলেন একজন ইয়াং ফ্রেশ পিএইচডি ফ্রম শিকাগো, কানাডিয়ান। একদম ইয়াং আমার চেয়ে একটু অল্প বয়স বেশি। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তো তার সঙ্গে কাজ করি ইত্যাদি, তো তারপরে সেও বেশি খোঁজখবর নেয় না, আমিও অন্যদিকে। আমি তখন থেকেই আবার একটু আর্টের লাইনে ঢুকলাম। ওখানে আমাদের ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্ট ছিল না; কিন্তু একটা গ্যালারি ছিল। গ্যালারিতে একজন রেসিডেন্ট আর্টিস্ট ছিলেন। তো সেই আর্টিস্ট আমাদের রোববারে ক্লাস নিতেন। তো যাঁরা আমরা যেতাম ক্লাস করতাম। তো এদিকে নজর। তারপরে এই লিটারেচার আর্ট পেইন্টিং ঘোরাঘুরি, বন্ধুবান্ধবের আড্ডাবাজি এই করতে করতে আমার, তারপর সুপারভাইজার চেঞ্জ। প্রফেসর সিমন্স চলে গেল অন্টারিও ওয়েস্টার্ন ছেড়ে টরন্টো। তো আমার আবার সুপারভাইজার এলেন নতুন। তিনি খুবই ভালো। চেয়ারম্যান অভিজ্ঞ কিন্তু ঠিক আমার লাইনের না; কিন্তু ভালো মানুষ। তো যাই হোক, এটা আমারই গাফিলতি।

প্রশ্ন

কয় বছর ছিলেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তিন বছরই ছিলাম। আমার তিন বছরের স্কলারশিপ যখন শেষ হয়ে গেল, আমি বললাম আমি চললাম। এটা কেমন কথা? তোমাকে আমরা পয়সা দিয়ে এনেছি, চলে যাবে মানে। বলি না আমি পারছি না, আমার ভালো লাগছে না, আমার এই–সেই। আরও কিছু হয়তো ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল। তো চলেই এলাম।

প্রশ্ন

বিয়ে করলেন কত সালে?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: বিয়ে করলাম আমি ’৬৮ সালে। ’৬৭ সালে ফিরেছি। ’৬৮ সালে আমার বিয়ে, প্রথম বিয়ে। এটা টিকল না। ’৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গেল, আমার বিয়েও ভেঙে গেল। তো যাই হোক আমার সাবেক স্ত্রী, প্রথম তিনি তখন পাকিস্তানে ইসলামাবাদে চাকরি করেন। তো ওটা ওখানে শেষ। তো ’৬৮। পরে আবার বিয়ে হলো। পরে ঠিক ১০ বছর পরে। ’৭৮ সালে।

আমার স্ত্রী তখন আনন্দ মোহন কলেজের বাংলার অধ্যাপক, টিচার।

প্রশ্ন

ওনার নাম কী?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওনার নাম রওশন আরা বেগম। রওশন আরা। উনি রিটায়ার করেছেন প্রফেসর হিসেবে ঢাকা কলেজ থেকে, হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। আমার এখানে আমাদের দুই মেয়ে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
প্রশ্ন

দেশে না বিদেশে ওনারা?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: দুজনেই ঢাকায় টিচার। একজন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ছোটটা। ও হলো ইকোনমিকসে এমএ ফ্রম টরন্টো, পিএইচডি ফ্রম মেলবোর্ন, ও নর্থ সাউথের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, দুবছর ধরে কানাডায়। বড়টি হলো ইংরেজির, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির টিচার এখন, এমএ ফ্রম ইউকে আর পিএইচডি করছে এই মুহূর্তে আমেরিকায়।

প্রশ্ন

দুজনেই তাহলে বিদেশে এখন নাকি?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: দুই মেয়ে বিদেশে, ছোট মেয়ে তো স্বামী–বাচ্চাদের দুই বাচ্চা নিয়ে; আর বড় মেয়ের স্বামী এখানে প্রফেসর ইউল্যাবে, আর ছেলেকে নিয়ে গেল এই গত মাসে।

প্রশ্ন

আচ্ছা স্যার, এখন আপনি তো ঢাকা বিষয়ে অনেক আগ্রহী, একটু আগে কথা প্রসঙ্গে আমরা আসছিলাম যে ঢাকায় এই যে শেরেবাংলা নগর, লুই কানের এই জাতীয় সংসদ ভবন, এসব বিষয়ে আপনার তো কিছু বলার আছে। এটা একটু শুনি।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: একটু আগে আপনি বলছিলেন না, ব্রিটিশ আমলের কিছু পরিকল্পনা ইত্যাদি। এগুলো তো টাউন প্ল্যান। আরেকটা জিনিস খেয়াল করেন, ব্রিটিশ আমলের যে রেললাইন, রেলওয়ে। ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ, তারপরে ঢাকা–টঙ্গী ইত্যাদি। এই রেললাইনটা আমাদের এই ২০০–৩০০ বছরের বা ২০০ বছরের, কত ১৮৬২তে রেললাইন বোধ হয় শুরু হয় প্রথম। তো এই রেললাইনটা দেখেন ঢাকা টু ময়মনসিংহ এখন। এর যে রাইট অব ওয়ে, এটাই তো আমাদের মেরুদণ্ড।

প্রশ্ন

নিশ্চয়।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এই যে আমরা বলি ঢাকা–ময়মনসিংহ রোড, এইটার পাশে রেললাইন এখন, এই রেললাইনকে ভিত্তি করেই এখন হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এখন হচ্ছে ছয় লেন, আট লেনের ঢাকা এয়ারপোর্ট, ঢাকা–ময়মনসিংহ রোড। ব্রিটিশ আমলে রেললাইন করে দিয়ে গেল এক লাইনের, তারপর জায়গা রাখল কত রাইট অব ওয়ে যেটাকে বলে, এত চওড়া যে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না এখন, ২০০ বছর পরেও। এটা আমি সব সময় মনে করি।

দুই নম্বর হলো পাকিস্তান আমলে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান ঢাকা। প্রথমটা ব্রিটিশ আমলে করল প্যাট্রিক গেডিস ১৯১৭ সালে। কিন্তু সেটা কাগজ, বই। ইমপ্লিমেন্টেশনে যেতে পারল না। এবং প্যাট্রিক গেডিস তো কোনো টাউন প্ল্যানার না, উনি ছিলেন বায়োলজিস্ট কিন্তু টাউন প্ল্যানিং শিখেছেন এবং ইন্ডিয়াতে ইনক্লুডিং বাংলাদেশ ঢাকা, প্রায় ১৬টা না ১৭টা শহরের প্ল্যান করেছেন। তো ওনার মূল কথা যেটা ছিল, তখন ১৯১৭ সবুজ এবং জল। জলভাগ, লেক–নদী–খাল এইটা সংরক্ষণ করো। এটা আমরা পারি নাই, পর্যায়ক্রমে নষ্ট। একমাত্র রিকভারি হলো হাতিরঝিল আর ধানমন্ডি লেক, কিছুটা…তো এখন ১৯৫৭ সালে, ’৫৯ সালে যে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা, এটা একটা ল্যান্ডমার্ক। এটা ব্রিটিশ একটা কোম্পানি করেছে। এইটাকে বেসিস ধরেই কিন্তু ঢাকা, বর্তমান ঢাকা গড়ে উঠেছে। আর এই যে ধানমন্ডিতে বসে আমরা কথা বলছি, এটা কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানের আগে। এটা ডিআইটির না, রাজউকের না, এটা হলো সিঅ্যান্ডবির। এবং এটা এই আজিমপুর কলোনি, মতিঝিল কলোনি, এই যে পরিকল্পিত অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্ল্যাট বাড়ি, নিউমার্কেট ইত্যাদি ধানমন্ডি, এগুলো পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে হামিদুল হক চৌধুরী যখন মিনিস্টার ছিলেন, পরবর্তীকালে তো রাজাকার হিসেবে…যাই হোক উনি একটা ফাউন্ডেশন দিয়ে গেছেন। আর এই ধানমন্ডি, এটা সিঅ্যান্ডবির পরিকল্পনা। মোটামুটি ভালো, যথেষ্ট ভালো এটা।

তবে একটা জিনিস ছিল ১০০ পারসেন্ট রেসিডেন্সিয়াল। শুধু দুই–তিনটা স্কুল—ধানমন্ডি বয়েজ স্কুল, ধানমন্ডি গার্লস স্কুল, এ ছাড়া কোনো কিছু অনাবাসিক না। একটা দোকান না, একটা ড্রাগ স্টোর না, একটা বাচ্চাদের স্কুল না। খেলার মাঠ দিয়েছে অবশ্য; খেলার মাঠ, লেক আর দুইটা স্কুল। তো এখন এই ৬০ বছরে বিশাল পরিবর্তন, এটা যে ডায়নামিকস কাজ করে আরবান ডেভেলপমেন্টে, এটা নিয়ে আমি, এখন ধানমন্ডি নিয়ে আবার নতুন করে লিখব, এটা অন্য রকম। তো, এখন এই যে ফাউন্ডেশনটা করে দিয়ে গেছে দোতলা বিল্ডিংয়ের জন্য। এক বিঘা জমিতে দোতলা একটা বিল্ডিং। বাগান, মাঠ, সামনে বাগান, হ্যাঁ গরু–ছাগল পালবে ইত্যাদি। সাবার্ব যা হয় তখন তো এটা সাবার্ব। তো এই জিনিসটা রয়ে গেছে এখনো, এই যে আমি ছয়তলা বিল্ডিংয়ে বসে আছি, ১০ তলা ১৪ তলা ১৫ তলা বিল্ডিং পর্যন্ত। তো এখন ডেনসিটি ২০ গুণ বেড়ে গেছে। তারপরেও যদি গাড়িঘোড়া না থাকে, কেউ না থাকে, তাহলে চলা যায়। ঠিক একই অবস্থা মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া এমনকি মিরপুর, এগুলো পাকিস্তান আমলের। এই যে বেসিক প্ল্যান, যেগুলো চমৎকার, কিন্তু যেহেতু জনসংখ্যা বেড়েছে, ডেনসিটি বেড়েছে, সবকিছুর সার্ভিস ডিমান্ড বেড়েছে, এটা ম্যানেজ করা কঠিন। তো এটা একটা।

আরেকটা হলো পাকিস্তান আমলের এটা, আমরা বাইচান্স পেয়ে গেছি শেরেবাংলা নগর।

প্রশ্ন

সেকেন্ড ক্যাপিটাল।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: আইয়ুব খানের আমলে। তো আমি বলি, এক খান অনুমোদন দিয়েছে আইয়ুব খান, আর আরেক খান আর্কিটেকচার প্ল্যানিংটা করেছেন। এবং আমি শেরেবাংলা নগরের, তখনকার দিনে হয়তো এটা ছিল, কিন্তু শহরের ভেতরে শহর, এটা ঠিক হয় নাই আমার মতে। এটা দূরে কোথাও করতে পারত। তখন তো দূরেই ছিল। তখন দূরে না, তখন ফার্মগেট ছিল কিন্তু। এই যে তেজগাঁও কৃষি ফার্ম ছিল, তারপরে ছিল… মাঝখানে মানে দিল একটা কনসোলেশন। তোমরা চাচ্ছ সেকেন্ড ক্যাপিটাল, দিলাম একটা ছোট্ট একটা মডেল। সংসদ ভবনটা তো অসাধারণ, সেটা লুই কানের চিন্তা থেকে। কিন্তু বাকিটুকু ওই যে রেসিডেন্সিয়াল মন্ত্রীদের দোতলা, তারপরে কর্মচারীদের দোতলা, ছোট ছোট বাংলো বা ফ্ল্যাট, এটা তো যায় না শহরের মাঝখানে।

প্রশ্ন

এটা আপনি তাই মনে করেন?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: অবশ্যই মনে করি। এবং এটা এখন যেটা হবে, এখন তো হয়ে গেছে, ওই যে হসপিটাল হয়ে গেছে না, ওর ওপাশে ওই যে ক্লাস থ্রি–ফোর কতগুলো কোয়ার্টার আছে, যেগুলো ভাঙাচোরা হয়ে গেছে, এই শেরেবাংলার আগেকার ওইখানে ওইটা যদি ভেঙে আগারগাঁওয়ে যে রকম ১০ তলা, ২০ তলা করেছে, আমার তো, আমি একসময় বলেছিলাম যে একটা বিল্ডিংও ২০ তলার নিচে হওয়া উচিত না আগারগাঁওয়ে। বরং আরও বেশি হোক।

প্রশ্ন

কিন্তু ওই যে পাসপোর্ট অফিস বা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আর্কিটেক্ট ইনস্টিটিউট, ওখানকার ওই জায়গাগুলো যে এখনো পাওয়া যাচ্ছে, সেটা তো ওই পরিকল্পনা করে গিয়েছিল।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: হ্যাঁ, ওই পরিকল্পনায়। তো ওইটা শেরেবাংলা, ওইটা আলাদা, কিন্তু ওই পাসপোর্ট অফিস বা দক্ষিণ দিকে যেটাকে আগারগাঁও বলি, শেরেবাংলা নগর বলি, এখানে ওই যে দোতলা বিল্ডিংগুলো, এগুলো তখন যাই হোক এখন আর চলে না। এখন যেমন ইয়েটা হয়ে গেছে না, এটার নাম কী?

প্রশ্ন

আনিসুল হক: স্যার... ন্যাম ভিলেজ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা, হ্যাঁ ন্যাম ভিলেজ। এই রকম এখন ন্যাম ভিলেজের মতো উত্তর দিকেও হওয়া উচিত এবং...

প্রশ্ন

যদিও স্যার, এই যে বেগম জিয়ার জানাজার সময় আমরা ড্রোন শট যেগুলো দেখলাম, ওপর থেকে খুব সুন্দর লাগে লেক–টেক মিলে। এখন ওই আপনি যে বাড়িগুলো শেরেবাংলা নগরের ছোট ছোট দোতলা বাড়ি আছে কিছু, ওগুলো যদি বড় করতে চান তাহলে এই সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যাবে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, ওইটা অত দূর পর্যন্ত যায় না। ওই যে শিল্প মেলা, যেখানে বাণিজ্য মেলা, ওই রাস্তাটা পর্যন্ত থাকুক। এটা প্রোটেক্টেড থাকুক। তারপরে ছেড়ে দিক।

প্রশ্ন

তারপরে হ্যাঁ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তারপরে তোমার এই যে এখন করেছে, ওটার নাম কী, আগারগাঁও নাকি শেরেবাংলা, যেখানে গভর্নমেন্ট বিল্ডিং আমাদের ইউজিসিসহ…। এখানে আমি অনেক দিন আগেই বলেছি, এখানে কোনো বিল্ডিং ২০ তলার নিচে হওয়া উচিত না। এই যে… ইউজিসি ভবন ছয়তলা। ক্যাপাসিটি নেই। এটা এখনই ভেঙে ২০ তলা করা উচিত।

প্রশ্ন

আচ্ছা।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওই জায়গাতেই হতে পারে। বিআইডিএস বিরাট জায়গা বাগান। ছোট্ট একটা ভবন বিরাট বাগান। এটা নিয়ে আমি তো বিআইডিএস বোর্ডের মেম্বার। এখন কথা হচ্ছে ওখানে বিল্ডিং করা দরকার। আচ্ছা, যাই হোক এই যে লুই কান যে ভবনটা করে দিলেন, মানে প্ল্যানটা, দুইটা জিনিস খুব আমার কাছে প্রশংসনীয়। একটা হলো তো আর্কিটেকচারালি, তো সংসদ ভবন আছেই লেক–টেক নিয়ে, আর হলো প্লাজা। এই যে দক্ষিণ প্লাজা। ফ্যান্টাস্টিক। এইটা না করলে কি এত বড়, কী বলে হাদির জানাজা হতো, বা খালেদা জিয়ার জানাজা হতো এ রকম? চিন্তার বাইরে। এবং একসময় আপনাদের কাগজেই বোধ হয়, বা কোনোখানে ইন্টারভিউ, এই যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আইল্যান্ড করল, ডিভাইডার, তখন আপনারা কমেন্ট নিয়েছিলেন আমার মনে আছে, আলী জাকের কমেন্ট করল ডিভাইডার করে গাছপালা করছে ভালো। আমি বললাম—না।

প্রশ্ন

না, ডিভাইডার আমারও পছন্দ হয় নাই।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এইটা একটা বিশাল প্লাজা হতে পারত। এখনো সময় আছে ভেঙে ফেলুক।

প্রশ্ন

ওই ডিভাইডারটা আমার পছন্দ হয় না।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: গাছপালা ভালো, কিন্তু এইখানে মার্চ করতে পারত। আমাদের কোনো মার্চিং প্লেস নেই, আমাদের কোনো ময়দান নেই। এইটা হতে পারত। তো যাই হোক, তো যেটুকু হয়েছে এটা বিশাল। এখন তো মওলানা ভাসানী আর শেখ মুজিবের পল্টন ময়দান নেই। তাই না, তখন তো আমরা ছোটবেলায় প্রত্যেকটা মিটিংয়ে যেতাম, আমার বাড়ির কাছে ছিল তো। তো মাওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিব, এঁদের লেকচার তো আমরা শুনেছি ওখানে। এখন তো আর কিছু নাই, সব বিল্ডিং, সব স্টেডিয়াম। এখন আছে এইগুলা। এখন রাস্তার ওপরে মিটিং করে। তো এখন রাস্তাটা বড়। এখন মেট্রো হলে কী হবে। কারা যেন পরামর্শ দিয়েছে না হাতিরঝিল ওই পূর্বাচলে যাওয়ার জন্য মেট্রো হবে। তো মেট্রো কোনখান দিয়ে করবে। আন্ডারগ্রাউন্ড করুক, তাহলে ঠিক আছে।

প্রশ্ন

আপনি, স্যার ঢাকা শহর নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা, মানে কোনো প্রস্তাব আছে কি না।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: না, প্রস্তাব তো অনেক আছে, আমি অনেক লিখেছি, ঢাকা ২০২৫ ঢাকা ২০৫০ আমার নতুন বই বের হবে এই মাসেই ‘ঢাকা মেগাসিটি’, ওর মধ্যে অনেকগুলো লেখার কালেকশন। এটা হলো যে এখন জাতিসংঘ কয় দিন আগে বলল না, নভেম্বরে, ডিসেম্বরের আগেই যে ঢাকা হলো পৃথিবীর দ্বিতীয় জনবহুল শহর। জনসংখ্যা কত ৩৭ মিলিয়ন, ৩৬ দশমিক ৬।

প্রশ্ন

সাড়ে ৩ কোটির বেশি, ৩ কোটি ৬০ লাখ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা কোন ঢাকা, এটা কেউ জিজ্ঞেস বলে না। কোন ঢাকা।

প্রশ্ন

হুম। এর এরিয়া কত বড়।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এর এরিয়া কত বড়। এটা কি সিটি করপোরেশন, যার এরিয়া হলো ৩০৬ বর্গকিলোমিটার, লোকসংখ্যা ১ কোটি ৩০ লক্ষ, আমার হিসাবে নাকি রাজউকের মেট্রোপলিটন এরিয়া, যার এরিয়া হলো ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার, লোকসংখ্যা দুই থেকে আড়াই কোটি তাহলে সাড়ে তিন কোটি কোত্থেকে পেল। সাড়ে তিন কোটি হলো বৃহত্তর ঢাকা জেলা। তার আয়তন ৭৪৪০ বর্গকিলোমিটার। আমি ইদানীং একটা লিখেছি। তো এখন সেখানে ছয়টা জেলা। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী। এই ছয়টা জেলার বর্তমান লোকসংখ্যা একটা স্টাডি আছে এসটিপিতে, ঠিক ৩৬ মিলিয়ন। তাহলে মেলে বৃহত্তর ঢাকা জেলা ছয়টা জেলা, সেটাকে যদি আমরা মেগাসিটি বলি বলতেই পারি।

প্রশ্ন

সেই মেগাসিটির একটা স্যার অভিন্ন পরিকল্পনা দরকার না?

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা একমাত্র আছে, সেটা হলো স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান, যেটাকে রিভাইজড ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান এখন বলে। এটা করেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। তারপরে ম্যাট ম্যাকডোনাল্ড নাকি ওরা।

প্রশ্ন

ডিএপির অধীনে আনা উচিত না। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এটা তো অনেক ছোট।

প্রশ্ন

হ্যাঁ, সেইটা পুরো ওই ছয় জেলা ধরে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান হলো রাজউকের ঢাকা। হ্যাঁ, আমি বলছি যে এখন যে ছয় জেলার ঢাকা সেটার একটা ডিএপি হওয়া উচিত কি না।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: ওইটা তো হওয়া না, ওইটার মাস্টারপ্ল্যান হওয়া উচিত, তারপরে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান। এটা অদ্ভুত দেশ। মাস্টারপ্ল্যান করল, স্ট্রাকচার প্ল্যান করল, রাজউক এই স্ট্রাকচার প্ল্যানটাকে সাইডে সরাই দিছে, চলে আসছে ডিটেইলে। আরে স্ট্রাকচার প্ল্যানটা তো আগে অ্যাপ্রুভড করবা। এটাই তো বৃহত্তর চিন্তা। ওই যে ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান যেটা ছিল ১৯৫৯–এর, এখন এইটা হলো। তারপরে এরা চলে লাফ দিয়ে, চলে গেল ডিটেইলে, আরে আগে তো বৃহত্তর প্ল্যানটা থাকবে। তো যাই হোক, তো এখন স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান, ওরা ওই বৃহত্তর ঢাকা জেলা ওইটা নিয়ে করেছে এবং যার পপুলেশন তারা তখনই প্রজেক্ট করেছিল ২০২৫-এ ৩৬ মিলিয়ন। তা–ই হচ্ছে। আচ্ছা, এখন এটার জন্য পরিকল্পনা, এখন সবাই আমরা বলি যে ডিসেন্ট্রালাইজ করো। তো ডিসেন্ট্রালাইজ করবে, এদিকে আর্কিটেক্টরা রিহাবরা সেন্টারে ডেনসিটি বাড়াতে চায়। এখন এটা হলো যে আমরা অনেক দিন থেকে বলছি, ডিসেন্ট্রালাইজ করো ডিকনসেনট্রেট করো, মানে ঢাকা থেকে লোক সরাও, সাভারে নিয়ে যাও, পূর্বাচলে নিয়ে যাও। পূর্বাচলে নিয়ে যাওয়া মানে এটাও ভুল প্ল্যানিং। পূর্বাচল হওয়া উচিত একটা সেলফ কনটেইন্ড নিউ সিটি, যেখানে এমপ্লয়মেন্ট থাকবে, ব্যবসা–বাণিজ্য থাকবে, ইন্ডাস্ট্রি থাকবে, ইন্ডাস্ট্রি মানে দূষণকারী ইন্ডাস্ট্রি না, এই যে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি এইসব অনেক কিছু হয়, ইউনিভার্সিটি থাকবে। ওইটা আলাদা একটা শহর হবে সম্পূর্ণ। সাভার আলাদা শহর হবে ইত্যাদি ওই যে কতগুলো স্যাটেলাইট টাউনের কথা বলেছিল না, ওই ডিএমডিপি শওকত আলী খান যেটাতে, ওইখানেই ছিল। তো এগুলো তো আমরা মানি নাই এবং এই সাড়ে তিন কোটি লোককে সাজানো যায় কি না এই এরিয়ার মধ্যে। ইন এ হ্যাবিটেবল সাসটেইনেবল ওয়ে। এইটা হলো প্ল্যান। তার মানে হলো ডেনসিটি প্ল্যানটা করতে হবে পুরো বৃহত্তর ঢাকার জন্য, সারা বাংলাদেশের জন্য।

প্রশ্ন

সারা বাংলাদেশের জন্য।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: সারা বাংলাদেশের জন্য। এত ছোট দেশ। এখন আমি এই প্রসঙ্গে বলে রাখি এটা ভালো, আমার জন্য খুব সুখবর যে আমি যেটা শুরু করেছিলাম, আমি কনভেনার হিসেবে জাতীয় নগর নীতিমালা। এটা ২০০৪–এ শুরু হয়। তারপরে ২০১১তে আমরা বিরাট কনফারেন্স করলাম বঙ্গবন্ধু সেন্টারে। সেখানে আমরা লিখিত ডকুমেন্ট। তো ওইটা পাস করল এই ডিসেম্বর ৩০ না ৩১ তারিখে ক্যাবিনেট। এত দিন লাগল, ২১ বছর। তো আমার সান্ত্বনা যে আমি ওইটার মূল উদ্যোক্তা, মানে কনভেনার।

প্রশ্ন

ঠিক আছে স্যার।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: তো এইটা, এখন এইটা পাশাপাশি, আবার এটা হলো মিনিস্ট্রি অব লোকাল গভর্নমেন্ট। মিনিস্ট্রি অব হাউজিং থেকে আবার করেছে স্পেশিয়াল প্ল্যানিং, স্থানিক পরিকল্পনা। এটা লোকে বুঝবে না। ও প্ল্যানাররা নিজেরাও বোঝে কি না সন্দেহ আছে। কারণ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ায় তারা আরবান রিজিওনাল প্ল্যানিং, স্পেশিয়াল প্ল্যানিং তো পড়ায় না। তাহলে সব ডিপার্টমেন্টগুলো ইউনিভার্সিটির আবার ভেঙে ডিপার্টমেন্ট অব স্পেশিয়াল প্ল্যানিং পড়াতে হবে। তো যাই হোক, তো এখন আমার সান্ত্বনা এটা, আমি অন্তত এখন আনন্দিত, এই গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আবার লিখছি, লেকচারও দিব। এই জাতীয় নগর নীতিমালা, একটা নীতিমালা, এটা আইন না, একটা চিন্তা।

প্রশ্ন

শিল্পী জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, অনেকের কাজ দেখছি স্যার আপনার এখানে। এখন বাংলাদেশের চিত্রকলায় এই মাস্টার পেইন্টাররা তো ভালোই অবদান রাখলেন, এখন বর্তমানে কী অবস্থা, স্যার।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এই মুহূর্তে যাই হোক, মানে বর্তমানে গত এশিয়ান শো যেটা হলো তিন বছর আগে, ওখানে আমার লেখাটা আছে, ওখানে ওই পর্যন্ত। তো অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ’৪৮ থেকে ২০২৪—অসাধারণ ডেভেলপমেন্ট মডার্ন আর্ট পেইন্টিং স্কাল্পচার এগুলোতে। ফাইন আর্টস, যেটাকে বলি চারুকলা। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যা করে গেছেন চিন্তার বাইরে। তিনি তো শিল্পী হিসেবে অসাধারণ বটেই; কিন্তু এই যে শিল্প বিদ্যালয় চিন্তা বাস্তবায়ন। এত সুন্দর ক্যাম্পাস সারা পৃথিবীতে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে, মানে সেন্টারে। তো আর শৈল্পিকভাবে আমি মনে করি বাংলাদেশের শিল্পচর্চা অত্যন্ত উন্নত।

প্রশ্ন

আপনার সবচাইতে প্রিয় শিল্পী কে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: অবশ্যই জয়নুল আবেদিন। এখনো, সব সময় থাকবে। কামরুল হাসান, সুলতান, কিবরিয়া স্যার, আমার চাচা আব্দুর রাজ্জাক, মুর্তজা বশীর, রশিদ চৌধুরী। রশিদ চৌধুরীর একটা ট্যাপেস্ট্রি আছে, খুব মূল্যবান, আমার আর বশীর মুর্তজা বশীরের একটা ড্রয়িং আছে…আমার একটা নতুন বই বের হচ্ছে ঢাকা মেগাসিটি, ওর মধ্যে একটা প্রবন্ধ, এটা আগেই ছাপা হয়েছিল বাংলায়, এখন ইংরেজি করেছি—ঢাকা ইন মডার্ন আর্ট অব বাংলাদেশ, এটা এই মাসেই বেরোবে। এর কাভার আমার, যত বইয়ের কাভার আমি করি, পেইন্টিং দিয়ে করি। আমি নিজেও করি তো কাভার। এই আব্দুর রাজ্জাকের এইটা, তারপরে আরও জয়নুল আবেদিনের এইটা, এখন যেটা করেছি কাভার, এটা ৬০০ পৃষ্ঠার বই, ৩৪টি আর্টিকেল; ১৯৬৪ থেকে ২০২৪ এর কাভারে দিয়েছি জামাল আহমেদের বুড়িগঙ্গা। আমার পাবলিশার হলো বিজু পাঠক সমাবেশ। বলে, স্যার, মেগাসিটি তো অন্য রকম। আমি বললাম, মেগাসিটি অন্য রকম, শুরুটা কোথায় এবং এই বুড়িগঙ্গা দিয়ে আমি ঢুকেছি। তো ওর বুড়িগঙ্গা নদীর খুব চমৎকার একটা পেইন্টিং, ওইটা আর এইটা ব্যাকগ্রাউন্ড ওইভাবে। তো আমি তো শহর আর পেইন্টিং আর্ট একসঙ্গে দেখি, ইনক্লুডিং রিকশা আর্ট। অসাধারণ। তো এগুলো বাংলাদেশের মডার্ন আর্ট এখন যেগুলো হচ্ছে, এই যে মনিরুল ইসলাম, এরা যেগুলো করে করেছে তো গিয়াস কাজী গিয়াস উদ্দিন। এরা তো ওয়ার্ল্ড ক্লাস। আর সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো এটা আমার লেখার মধ্যে আছে মহিলা শিল্পীরা। রোকেয়া আমার সাবজেক্ট স্যান্ড স্কাই এন ওয়াটার ওর অনেকগুলো ছবি। তারপরে ফরিদা জামান একুশে পদক পাওয়া। আমিই বোধ হয় নমিনেট করেছিলাম ইউজিসি থেকে। তো এরা তো অসাধারণ শিল্পী। তারপরে আরও আছে নাজলী এরা ওরা… তো মহিলা শিল্পী আর ইয়াং জেনারেশন নতুন নতুন মিডিয়া, এখন তারা তো আবার মাল্টিমিডিয়াতে করে ভিজ্যুয়াল করে ভিডিও করে; এগুলো হয়তো আমার লাইনে না কিন্তু প্রশংসনীয় উদ্যোগ, ক্রিয়েটিভ খুব। এখন তো অনেক। তো এখন এদের তো অবদান আর সার্বিকভাবে আমাদের জীবনে আছে হয়তো, এখন আপনারাও ঘোরাফেরা করেন, দেখবেন কার ঘরে কী ছবি আছে।

প্রশ্ন

আর এটা শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশ নিয়ে কি আপনি আশাবাদী, নাকি হতাশ ভবিষ্যৎ নিয়ে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: কঠিন প্রশ্ন। আমার একটা বই আছে ‘বাংলাদেশের ভূগোল’। তার মধ্যে শেষটা হলো এ রকম—বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ। তো ওখানে আমার শেষ কথাটা ছিল এই সামাজিকভাবে অর্থনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে অনেক ওলট–পালট হচ্ছে, হবে; কিন্তু আমার দেশ বাংলা, ভৌগোলিক বাংলা, এটা আশা করি টিকে থাকবে।

প্রশ্ন

আমরা এটা দিয়ে শেষ করি তাহলে। সাংস্কৃতিকভাবে রাজনৈতিকভাবে অর্থনৈতিকভাবে সামাজিকভাবে নানা রকম উত্থানপতন মিক্সড হবে, ওলটপালট হবে; কিন্তু আমাদের দেশ বাংলা, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে। এবং এটা অপরাজেয়।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: এবং আরেকটা কথা, অন্তিম বিবেচনায়, চূড়ান্ত বিবেচনায় বাংলাদেশ ও বাঙালি টিকে থাকবে।

প্রশ্ন

দর্শকমণ্ডলী, আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। এতক্ষণ আমরা ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং আমাদের একজন উজ্জ্বল বাতিঘর অধ্যাপক নজরুল ইসলামের কথা শুনলাম। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু আমরা জানতে পারলাম। নিশ্চয়ই আমাদের এই সময়টা আমাদেরকে ঋদ্ধ করবে। সবাই ভালো থাকবেন।