তিন মাস ধরে নথিপত্র সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণে।

বিয়ের ১১ বছর পর সন্তানের মা হয়েছিলেন ফারজানা ইসলাম। তা-ও বহু ব্যয় করে, আইভিএফ (বিশেষ প্রজনন চিকিৎসা) পদ্ধতিতে।
ফারজানা সন্তানের নাম রেখেছিলেন ফাইয়াজ হাসান তাজিম। ফেসবুক প্রোফাইলে নিজের নাম দিয়েছিলেন ‘তাজিমের আম্মু’।
হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২২ এপ্রিল মারা যায় তাজিম। বয়স হয়েছিল ৮ মাস ১৮ দিন। হাম ও হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তাজিমের মতো ৮৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই শিশু।
হামের ঝুঁকিকে অগ্রাধিকার না দেওয়া, টাইফয়েডের টিকাদান কর্মসূচির জন্য হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন বারবার পেছানো, কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম টিকা কেনা এবং ঝুঁকির তথ্য যথাসময়ে বিশ্লেষণ না করার মধ্য দিয়ে সংকটটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
দেশে বহু বছর ধরে হাম নিয়ন্ত্রণেই ছিল। হামে শিশুর মৃত্যু হয়েছে—এমন খবর ছিল বিরল। এ বছর কেন বিপর্যয় তৈরি করল, দায় কাদের, তা নিয়ে তিন মাস ধরে অনুসন্ধান করেছে প্রথম আলো। সরকারের নথিপত্র সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে গাফিলতির কারণে।
হামের ঝুঁকিকে অগ্রাধিকার না দেওয়া, টাইফয়েডের টিকাদান কর্মসূচির জন্য হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন বারবার পেছানো, কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম টিকা কেনা এবং ঝুঁকির তথ্য যথাসময়ে বিশ্লেষণ না করার মধ্য দিয়ে সংকটটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
এ ব্যর্থতার দায় কোনো একটি সরকার বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সমন্বয়হীনতা, ভুল অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক জটিলতা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
হামের টিকাদানে পরে জাতীয় ক্যাম্পেইন হলেও অসম্পূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
হাম, হামের প্রাদুর্ভাব ও হামের টিকা নিয়ে অনুসন্ধানের একটি পর্যায়ে তথ্য দিতে চায়নি ইপিআই, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয়। তারপরও পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা কোনো তথ্য দেননি।
বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ কমিটির একাধিক সদস্যের কাছে তথ্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। দুটি কমিটির সভার কার্যবিবরণী দিতে সদস্যরা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে একবার তথ্য দেওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ।
অবশ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ, টিকা ক্রয় ও সরবরাহের বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্যাভি সূত্রে বিভিন্ন তথ্য ও নথি পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য ও নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ রয়েছে।
হাম নির্মূল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের একটি সভা গত জুনে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি।
এক. ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, সেটি বারবার পিছিয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয়। অর্থাৎ যে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সারা দেশের সব টিকাদানযোগ্য শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়, সে ক্যাম্পেইন পিছিয়ে যায় সাত মাস। এর আগে ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে। যথাসময়ে ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণ হামকে গুরুত্ব কম দেওয়া। টাইফয়েডের টিকাদানে বেশি জোর দেওয়া।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও স্বীকার করেছে, টাইফয়েডের টিকাদান কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই হামের ক্যাম্পেইন পিছিয়েছিল।
দুই. ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিয়মিত কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় হাম-রুবেলার টিকা ৪২ শতাংশ কম কেনা হয়েছে।
তিন. টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকা, প্রকৃত টিকাদানের হার সরকারি হিসাবের চেয়ে কম হওয়া এবং পরীক্ষাগারে হাম শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার তথ্য ছিল। কিন্তু ইপিআই, স্বাস্থ্য বিভাগ, জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলো এসব তথ্য থেকে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি চিহ্নিত করে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সতর্কবার্তা দেয়নি।
সব শিশু টিকা পেলে সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত না।অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক
চার. অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন করে, টিকা ক্রয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং সে সময়ে ইউনিসেফের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব তৈরি হয়। এতে টিকা কেনায় বিলম্ব হয়; পাশাপাশি ২০২৫ সালে স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন দাবিতে একাধিকবার কর্মবিরতি ও ধর্মঘটে যান। এতে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং টিকার ক্যাম্পেইনও পেছায়।
পাঁচ. প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় ক্যাম্পেইন হলেও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ঘাটতি ছিল। বিপুলসংখ্যক শিশু শুরুতেই হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
সবকিছুর ফল হলো শিশুমৃত্যু। হাম নির্মূল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের একটি সভা গত জুনে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি।
দেশের পাঁচজন রোগতত্ত্ববিদ, টিকাবিশেষজ্ঞ, ভাইরাস–বিশেষজ্ঞ, শিশুস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেছেন, ছয় মাস বা তারও আগে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ করা সম্ভব হলে হয়তো হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিত না। দেখা যদি দিত, তাহলে তা এত ব্যাপক হতো না।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলার সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাবেক উপব্যবস্থাপক তাজুল এ বারী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুন্সী, ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরির প্রধান খন্দকার মাহবুবা জামিল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদও মনে করেন, গত সেপ্টেম্বরের দিকে জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে বা সব শিশুকে টিকার আওতায় আনলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিত না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সব শিশু টিকা পেলে সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত না।
হামের ঝুঁকি উপেক্ষা, জোর টাইফয়েডে
ইপিআইয়ের মাধ্যমে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হাম-রুবেলার টিকা (এমআর) দেওয়া শুরু হয়। নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে এমআর টিকার প্রথম ডোজ শিশুদের ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়।
নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের আওতায় আনার জন্য জাতীয় ক্যাম্পেইন করা হয়।
টিকাবিশেষজ্ঞ ও ইপিআইয়ের সাবেক উপপরিচালক তাজুল ইসলাম বারী প্রথম আলোকে বলেন, ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকার কিছু বাংলাদেশ নিজের অর্থ কেনে, কিছু কেনে ভর্তুকি মূল্যে। এই ভর্তুকি দেয় গ্যাভি। ইপিআইয়ের হামের টিকা বাংলাদেশ নিজের টাকায় কেনে। আর যেকোনো জাতীয় ক্যাম্পেইনে টিকার পুরো খরচ বহন করে গ্যাভি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, দেশে হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০০৬ সালে। এরপর ২০১০, ২০১৪ ও ২০২০ সালে (ওই বছর ডিসেম্বরে শুরু হয়ে পরের মাস জানুয়ারিতে শেষ) ক্যাম্পেইন হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয়েছে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে সময়ে; যদিও তা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা ছিল।
দেশে কোন টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন কখন হবে, সে সিদ্ধান্ত নেয় আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটি (আইসিসি)। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইপিআই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও টিকাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটির প্রতিনিধিরা থাকেন।
আইসিসির সভার সিদ্ধান্তে হামের টিকার ক্যাম্পেইন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে চলে যায়।
২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত আইসিসির ১৩টি সভার মধ্যে ১১টির কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। তাতে দেখা যায়, সভাগুলোয় টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব পেলেও হামের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোনো পূর্বাভাস বা সতর্কতার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেও সেটি বারবার পিছিয়েছে।
টাইফয়েডের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইনের আলোচনা শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। ২০২২ সালের ১৮ মে অনুষ্ঠিত আইসিসির ৬১তম সভায় ইপিআই কর্মকর্তারা টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের সুপারিশ করেছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সচিব লোকমান হোসেন মিয়া।
জাতীয় কর্মসূচিতে টাইফয়েডের টিকা সংযোজনের সুপারিশ করেছিল নাইট্যাগ (টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি)। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আইসিসির ৬২তম সভায়ও টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন নিয়ে কথা হয়। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার।
পরে ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আইসিসির ৬৭তম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দেশে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইন হবে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইসিসির প্রথম সভা হয় ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই সভায় ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টাইফয়েডের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন নতুন স্বাস্থ্য সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ।
এরপরের সভাটি হয় ৯ মাস পরে—২০২৫ সালের ২৪ জুনে। ওই সভায় টাইফয়েড ও হামের টিকার ক্যাম্পেইনের সময়ে পরিবর্তন আসে। এতে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান।
সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন পিছিয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, টিকা ক্রয় ও সহায়তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভি থেকে টাইফয়েডের টিকা সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় ক্যাম্পেইন পেছাতে হবে।
ওই সভায় হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইনও পেছানোর সিদ্ধান্ত হয়। তখন বলা হয়, ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইন হবে। সভায় বলা হয়, যেহেতু সেপ্টেম্বরে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং গ্যাভি থেকে হাম-রুবেলার টিকা পেতে বিলম্ব হচ্ছে, তাই হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন পেছাবে।
সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, আইসিসির সভাপতি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন সচিব মো. সাইদুর রহমান টাইফয়েড ও হামের টিকার ক্যাম্পেইন একই সময়ে করার অভিমত দেন। তবে দুটি ক্যাম্পেইন একই সময় করা সম্ভব নয় বলে মত দেন ইউনিসেফ প্রতিনিধি মো. জাহিদ হোসেন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি জয়ন্ত নিয়াগেনে। অন্যদিকে ইপিআইয়ের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের পর হামের টিকার ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য কম পক্ষে দুই মাস সময় প্রয়োজন।
টাইফয়েডের ক্যাম্পেইনের কারণে হাম-রুবেলার কর্মসূচি পিছিয়েছিল কি না—প্রথম আলোর এ প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিখিতভাবে বলেছে, টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের কারণে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন পিছিয়েছিল।
যদিও ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয়নি। কেন শুরু হয়নি, তা জানা যায় ওই বছর ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত আইসিসির ৭০তম সভার কার্যবিবরণীতে। এতে দেখা যায়, দেশব্যাপী স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতির কারণে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি শেষ হয়নি। তাই ক্যাম্পেইন পিছিয়ে ১২ অক্টোবর নেওয়া হয়। সভায় হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন পেছানোর বিষয়ে আলোচনা হলেও তারিখ ঠিক করা হয়নি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন শেষ হয়। এরপর হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইনের তারিখ নির্ধারিত ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আইসিসির সভায়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ১৯ মে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন হবে। এতে জানানো হয়, হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইনের টিকা ইপিআই সদর দপ্তরে চলে এসেছে। বিএনপি সরকার ক্যাম্পেইন এক মাস পিছিয়ে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে করে।
টাইফয়েডের ক্যাম্পেইনের কারণে হাম-রুবেলার কর্মসূচি পিছিয়েছিল কি না—প্রথম আলোর এ প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিখিতভাবে বলেছে, টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের কারণে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন পিছিয়েছিল।
টিকাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা জনস্বাস্থ্যে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দাবি করে। এসবের বাইরে ভিন্ন কোনো বিবেচনায় এর দায়িত্বে কাউকে বসানো হলে তাদের দ্বারা টিকা ব্যবস্থাপনা কখনো সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে না।তৌফিক জোয়ার্দার, সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ই-মেইলে গ্যাভির জেনেভা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। গ্যাভির পক্ষ থেকেও বলা হয়, হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন স্থগিত হয়েছিল প্রস্তুতি-সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ের কারণে। এর মধ্যে আছে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন, টিকার বিষয়ে প্রতিযোগিতামূলক অগ্রাধিকার (যেমন টাইফয়েডের টিকার প্রবর্তন) এবং কার্যকর পরিকল্পনার জন্য বাড়তি সময়।
আইসিসি সভার কার্যবিবরণী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিখিত বক্তব্য এবং গ্যাভির মতামত থেকে এটা স্পষ্ট যে টাইফয়েডের টিকার কারণে হামের টিকার ক্যাম্পেইন পিছিয়েছে বারবার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাইদুর রহমান গত ২২ জুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইসিসির মিটিংয়ে টিকাসংক্রান্ত ব্যাপারে বক্তব্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন ইপিআইয়ের কর্মকর্তারা। ইপিআইয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যকে জোরদার করেন বা সমর্থন করেন ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু বছর ধরে ইপিআইয়ের সঙ্গে কাজ করে। মন্ত্রণালয়ের আমরা নির্ভর করি ইপিআই, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর।’
কোনো মিটিংয়ে এই তিন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হামের ঝুঁকির কথা শোনেননি বলে দাবি করেন সাবেক এই সচিব। তিনি বলেন, এ তিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি কোনো মিটিংয়ে হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপস্থাপন করেননি। তাঁরা কোনো মিটিংয়ে বলেননি যে হামের টিকার ক্যাম্পেইনের পর টাইফয়েডের ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে।
দেশে টাইফয়েডে মানুষ আক্রান্ত হয়, মারাও যায়। কিন্তু কত মানুষ আক্রান্ত হয় ও কত মানুষ মারা যায়, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। জাতীয়ভাবে কোনো জরিপও নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের বৈশ্বিক রোগতাত্ত্বিক নিরীক্ষা ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডি ২০২৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪ লাখ ৩০ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়। এতে মারা যায় ছয় হাজারের কিছু বেশি মানুষ।
সাম্প্রতিক কালে গবেষকেরা দেখেছেন, টাইফয়েডের জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। এতে জটিলতা বাড়ছে, খরচ বাড়ছে। তাই টিকার মাধ্যমে টাইফয়েড প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে এসব জটিলতা এড়ানো সম্ভব। এ কারণে কিছু গবেষক ও বিজ্ঞানী বেশ কয়েক বছর ধরে টাইফয়েডের টিকার ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের বলে আসছেন।
টাইফয়েড নিয়ে গবেষণা করা একজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত ১০ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, হঠাৎ হাজার হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হবে—এমন কোনো ঝুঁকি নেই। টাইফয়েডের ‘আউটব্রেক’ বা প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি খুবই কম। কিন্তু এই ঝুঁকি আছে হামের। যে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থাকে, অগ্রাধিকার বিবেচনায় সেই রোগের টিকাদান আগে হওয়া দরকার।
অগ্রাধিকার দিয়ে টাইফয়েডের টিকা বাংলাদেশের মানুষকে দেওয়ার যুক্তি কী ছিল, কিসের ভিত্তিতে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা পরিষ্কার নয়। হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইন আগে করে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন পরে করা যেত।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক তৌফিক জোয়ার্দার টিকার রাজনৈতিক-অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই প্রবাসী জনস্বাস্থ্যবিদ প্রথম আলোকে বলেন, টিকাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা জনস্বাস্থ্যে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দাবি করে। এসবের বাইরে ভিন্ন কোনো বিবেচনায় এর দায়িত্বে কাউকে বসানো হলে তাদের দ্বারা টিকা ব্যবস্থাপনা কখনো সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে না।
তৌফিক জোয়ার্দার বলেন, বর্তমান সংকটের পেছনে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আমলাতান্ত্রিক অক্ষমতা দায়ী। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সময়মতো সঠিক ও কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব পালন করেছে বলেও তিনি মনে করেন না।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে টিকা কম কিনছে।
বছরের পর বছর টিকার ঘাটতি
ইপিআই ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না, তার বড় উদাহরণ টিকার চাহিদা ও সরবরাহে ব্যাপক ফারাক।
টিকা ক্রয়সংক্রান্ত দলিল প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সভার আয়োজন, সভার কার্যবিবরণী তৈরিতে ইপিআইকে সহায়তা করে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দেশে বছরের পর বছর প্রয়োজনের চেয়ে কম টিকা আসছে জেনেও তারা এ বিষয়ে কোথাও কিছু বলেনি। আইসিসির সভায় এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে টিকা কম কিনছে। ইপিআইয়ের দুজন কর্মকর্তা ও ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা আলাদাভাবে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে প্রতি মাসে গড়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ভায়াল হাম-রুবেলার টিকার দরকার হয়। বছরে প্রয়োজন ২৫ লাখ ৮০ হাজার ভায়াল। এক ভায়ালে পাঁচ ডোজ টিকা থাকে। সেই হিসাবে বছরে ১ কোটি ২৯ লাখ ডোজ টিকার দরকার হয়।
২০২০ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার যথেষ্ট পরিমাণে টিকা কিনতে চায়নি। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অন্য কারও মাধ্যমে টিকা কিনতে চেয়েছিলেন। টিকার সংকট ছিলই।সরদার সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে টিকার প্রয়োজন ছিল ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডোজ। টিকা এসেছিল ২ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ডোজ, অর্থাৎ ৩ বছরে প্রয়োজনের চেয়ে ৪২ শতাংশ টিকা কম কিনেছে বাংলাদেশ। মনে রাখা দরকার, টিকার একটি অংশ ওয়েস্টেজ বা অপচয় হয়। একটি ভায়ালে পাঁচ ডোজ থাকলেও সব সময় তা পাঁচটি শিশুকে দেওয়া সম্ভব হয় না।
টিকার যে ঘাটতি ছিল, সে কথা ২১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিখিতভাবে প্রথম আলোকে জানিয়েছে। তারা বলেছে, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় গুদামে হামের টিকার সংকট ছিল। বিভিন্ন সময় মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করার মতো হাম-রুবেলার পর্যাপ্ত টিকা ছিল না। তবে মাঠপর্যায়ে টিকা ছিল কি না, সে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রথম আলোকে দিতে পারেনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে ৩ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ২০২০ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার যথেষ্ট পরিমাণে টিকা কিনতে চায়নি। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অন্য কারও মাধ্যমে টিকা কিনতে চেয়েছিলেন। টিকার সংকট ছিলই।
মাঠপর্যায়ে হামের টিকার সংকটের বিষয় জানাজানি হয় ২০২৪ সালের শুরুতে। ওই বছরের জানুয়ারিতে সাংবাদিক রাশেদ আহমেদ তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার জন্য যশোরের একটি টিকাকেন্দ্রে যান। তিনি দুই সপ্তাহে কয়েক দফা গিয়েও টিকার ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি (২০২৪) ওই সাংবাদিক বেশ কয়েকটি জেলায় টিকার সংকট নিয়ে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের প্রথম পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন।
২০২৫ সালের ২১ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আফরিন মাহমুদ ইউনিসেফের স্বাস্থ্য শাখার প্রধানকে একটি চিঠি দেন, যেখানে টিকার সংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তিনি চিঠিতে বলেন, ৩০ জুনের (২০২৫) মধ্যে হামসহ চারটি টিকার মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। তিনি অনুরোধ করেন, আগস্ট মাস পর্যন্ত চলার জন্য ইউনিসেফ যেন এই পাঁচ টিকা অগ্রিম সরবরাহ করে। চিঠির পর হামসহ চার ধরনের টিকা সরবরাহ করে ইউনিসেফ।
টিকার সংকটের সঙ্গে তখন মাঠকর্মীদের কর্মবিরতি ও ধর্মঘট নিয়মিত টিকা কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীরা বিভিন্ন দাবিতে দুই দফায় কর্মবিরতি এবং একবার প্রায় এক মাসের জন্য ধর্মঘটে যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রথম আলোকে লিখিতভাবে জানিয়েছে, এই কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল।
প্রথম আলোকে দেওয়া লিখিত ব্যাখ্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হামের প্রাদুর্ভাব তখনই হতে পারে, যখন প্রতিটি কমিউনিটিতে হামের টিকার কভারেজ সন্তোষজনকভাবে বেশি না থাকে অথবা যখন বিভিন্ন পকেটে (ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন এলাকা) টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন হচ্ছে, ইমিউনিটি গ্যাপের কারণে বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখা যায়, উদ্দিষ্ট সব শিশু টিকা পায় না। ২০২৫ সালও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে ওই বছর টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। ইপিআইয়ের ড্যাশবোর্ডে দেখানো হয়েছিল, ২০২৫ সালে হামের টিকা পেয়েছিল ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ শিশু। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ইপিআইয়ের ওয়েবসাইটে এই তথ্য ছিল। পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়।
ইপিআই ১০ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেছে, ২০২৫ সালে ৯ মাস বয়সী ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে। আর ১৫ মাস বয়সী ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিশু হাম-রুবেলার টিকা পায়।
এ হিসাব প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, ইপিআই যত শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে, বাস্তবে দেওয়া হয় তার চেয়ে কম। প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। যেমন ইপিআইয়ের হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে হামের টিকার কাভারেজ ছিল ৯৩ শতাংশ। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, হামের টিকা পেয়েছে আসলে ৮১ শতাংশ শিশু। মানে হলো টিকা পাওয়ার উপযুক্ত ১৯ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে ছিল। কোনো কোনো জেলায় এই হার আরও বেশি। এভাবে প্রতিবছরই বেশ কিছু শিশু নিয়মিত টিকা কার্যক্রম থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের পর আর কোনো মূল্যায়ন প্রতিবেদন করা হয়নি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা বিগত পাঁচ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হামের রোগীদের বহু অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাতে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই টিকার বাইরে ছিল।
প্রথম আলোকে দেওয়া লিখিত ব্যাখ্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হামের প্রাদুর্ভাব তখনই হতে পারে, যখন প্রতিটি কমিউনিটিতে হামের টিকার কভারেজ সন্তোষজনকভাবে বেশি না থাকে অথবা যখন বিভিন্ন পকেটে (ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন এলাকা) টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন হচ্ছে, ইমিউনিটি গ্যাপের কারণে বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কয়েকটি কারণের সংমিশ্রণে ইমিউনিটি গ্যাপ হয়েছে। এর মধ্যে আছে নিয়মিত টিকা না পাওয়া, বিভিন্ন এলাকা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকার অসম কভারেজ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা।
প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা বিগত পাঁচ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হামের রোগীদের বহু অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাতে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই টিকার বাইরে ছিল।
যেমন ২ আগস্ট হামে আক্রান্ত ২১ দিনের একটি শিশুকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ওই শিশুর মায়ের বয়স ১৫ বছর। বাড়ি শরীয়তপুরে। সন্তান প্রসবের ১০ দিন পর মা হামে আক্রান্ত হয়। মা সুস্থ হওয়ার পর শিশু হামে আক্রান্ত হয়। শিশুসহ মা আসে ওই হাসপাতালে।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্রথম আলোকে বলেন, ওই কিশোরী মা শুধু হামের টিকা নেয়নি তা নয়, জীবনে সে কোনো টিকাই নেয়নি।
সতর্কবার্তা ছিল কি
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর বিষয়ে বা বাদ পড়া শিশুদের পুঞ্জীভূত সংখ্যা থেকে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব বিষয়ে ইপিআই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কোনো তথ্য বা বার্তা দেয়নি। আইসিসির কোনো সভায় এ বিষয়ে আলোচনার নজির নেই।
এমনকি ২০২৩ সালের মূল্যায়ন প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি বা প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়নি।
তবে গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স দাবি করেন, টিকার ঘাটতির কারণে একটি প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে—এমন সতর্কবার্তা ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকাসংকটের কথা ছিল। তারা ১০টি বৈঠকে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিলেন।
ওই দিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে করা যোগাযোগগুলোয় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ ছিল না।
রানা ফ্লাওয়ার্স ও মো. সায়েদুর রহমানের বক্তব্য গত ২১ মে প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইপিআইয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য চেপে যাওয়ার উদাহরণ পাওয়া গেছে। যেমন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরি নিয়মিতভাবে হামের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল ইপিআইকে পাঠায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাম বাড়ার বিষয়টি পরীক্ষায় ধরা পড়ে। ওই ফলাফল ল্যাবরেটরির পক্ষ থেকে ইপিআইতে পাঠানো হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হাম শনাক্ত দ্বিগুণ হয়। ল্যাবরেটরি সেই তথ্যও ইপিআইকে পাঠায়। ইপিআইয়ের পক্ষ থেকে এসব তথ্য উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। এই সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বড় কোনো আলোচনায় হাম বা টিকার বিষয়গুলো স্থান পেতে দেখা যায়নি।
ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) টিকা বিষয়ে সরকারকে কারিগরি পরামর্শ দেয়। যদিও তারা হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে সরকারকে সতর্কবার্তা দেয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাইট্যাগের একজন সদস্য ১০ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের পক্ষ থেকে গত ৩ মার্চ হাম প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তত দিনে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে।
একইভাবে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি (এনভিসি) ফর এলিমিনেশন অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা। ২০১৭ সাল থেকে এই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি ১০ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠকে দেশের কোন কোন এলাকায় টিকার কভারেজ কম, সে বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়। কী করলে দেশ থেকে হাম নির্মূল করা যাবে, সে বিষয়েও কথা হয়। তবে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে হামের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি নিয়ে কথা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অবশ্য টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি এগিয়ে নিতে দেখা গেছে, যা হামের টিকা কেনা বিলম্বিত করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার কতটা আন্তরিক ছিল
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। এই সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বড় কোনো আলোচনায় হাম বা টিকার বিষয়গুলো স্থান পেতে দেখা যায়নি। তখনকার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরহাজান বেগম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন তাঁদের অগ্রাধিকারের শীর্ষে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অবশ্য টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি এগিয়ে নিতে দেখা গেছে, যা হামের টিকা কেনা বিলম্বিত করেছে।
১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি ছিল স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি। স্বাস্থ্য–সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি মানুষের কাছে এটি সেক্টর কর্মসূচি নামে পরিচিতি পায়। মূলত দাতানির্ভর এই উন্নয়ন কর্মসূচি কখনো ১০টি, কখনো ২৯টি বা কখনো ৩২টি অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতো। একই সঙ্গে উন্নয়ন ও রাজস্ব কর্মসূচি পাশাপাশি চলায় কাজের দ্বৈততার জটিলতা, দাতাদের অর্থ কমে আসা, বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি—এসব কারণে সেক্টর কর্মসূচি থেকে সরকার সরে আসার চেষ্টা করছিল।
দাতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আগে থেকে প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু অভিযোগ আছে, পুরোদমে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর কর্মসূচি বাতিল করে। অন্যান্য আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো এর প্রভাব পড়ে ইপিআইতে। আগের ব্যবস্থায় দরপত্র ছাড়াই সহজে টিকা কেনা যেত। অন্যদিকে নতুন ব্যবস্থা, অর্থাৎ রাজস্ব খাতের কেনাকাটায় দরপত্রপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে।
মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যবিষয়ক অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় ইপিআই পরিচালিত হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আইসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নিয়মিত ইপিআইয়ের সব টিকার খরচ উন্নয়ন বাজেটের পরিবর্তে রাজস্ব বাজেট থেকে খরচ করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সেক্টর কর্মসূচি পুরোপুরি বাদ দিয়ে প্রায় সবকিছু রাজস্ব খাতে আনার চেষ্টা করে। একটি সূত্র বলছে, কীভাবে সরে আসতে হবে, তার জন্য পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একজন গবেষকের।
সেক্টর কর্মসূচি থেকে সরে আসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অংশীজনের সঙ্গে সাতটি সভা করে। ওই বছরের ৬ মার্চের একটি সভায় সেক্টর কর্মসূচি থেকে সরে আসার বা সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, এতে টিকা ক্রয়সংক্রান্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়, অর্থাৎ এই সিদ্ধান্ত ছিল টিকা ক্রয়ের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা।
ইউনিসেফ থেকে টিকা সহজে পাওয়া গেলেও খরচ বেশি। টিকা কিনে দেওয়ার জন্য ইউনিসেফ কিছু ফি নেয়। ইউনিসেফের ভাষায়, এর মধ্যে আছে হ্যান্ডেলিং ফি ৪ শতাংশ, উড়োজাহাজভাড়া ও বিমা বাবদ ৪ থেকে ৭ শতাংশ এবং কন্টিজেন্সি বাফার হিসাবে ৬ শতাংশ। কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট টিকার খরচের ১৭ শতাংশ নেয় ইউনিসেফ।
দাতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আগে থেকে প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু অভিযোগ আছে, পুরোদমে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর কর্মসূচি বাতিল করে। অন্যান্য আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো এর প্রভাব পড়ে ইপিআইতে। আগের ব্যবস্থায় দরপত্র ছাড়াই সহজে টিকা কেনা যেত। অন্যদিকে নতুন ব্যবস্থা, অর্থাৎ রাজস্ব খাতের কেনাকাটায় দরপত্রপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে।
আগের ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ায় মাঠপর্যায়েও সমস্যা হয়। টিকাদানকেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ১ হাজার ৩২৬ জন পোর্টারের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। তাঁরা আগে বেতন পেতেন অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে। এক বছর তাঁরা বেতন পাননি। এতে তাঁদের অনেকেই কাজে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। টিকাদানের হার কম হওয়ার এটি একটি কারণ।
ভারতের দিল্লিতে ৭-৯ জুলাই অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক আঞ্চলিক সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুনে সেক্টর কর্মসূচি শেষ হয়ে যায়। নতুন ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরি হতে বিলম্ব হওয়ায় টিকা ক্রয় বিলম্বিত হয়। এ কারণে কয়েকটি টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়। অবশ্য তার মধ্যে হামের টিকা ছিল না।
এদিকে কার্যবিবরণী বলছে, ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আইসিসির সভায় ইপিআইয়ের প্রতিনিধি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি ভিন্ন ধরনের ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণে টিকা মজুতের ঘাটতি দেখা দেয়।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, টিকার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অর্থায়নে এডিবির অপেক্ষায় কেন বসে থাকতে হবে? অগ্রাধিকার দিলে সরকার নিজের তহবিল থেকেই এ টাকার ব্যবস্থা করতে পারত।
এডিবির টাকার ওপর ভরসা
সরকার টিকা কেনার টাকার একটি অংশের জন্য নির্ভর করেছিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি ঋণের ওপর।
ওই ঋণ এডিবি দিয়েছিল কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায়। যদিও পুরো অর্থ তখন ব্যয় হয়নি এবং অব্যয়িত টাকার পরিমাণ ১৭ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার (বর্তমান মূল্যে ২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা)। এই টাকা ইউনিসেফের কাছে রাখা ছিল।
২০২৫ সালের ২১ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এর মধ্য থেকে ৬০৯ কোটি টাকা টিকা কেনায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে এ-সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব ২০২৫ সালের ১ জুন এডিবিকে পাঠানো হয়। প্রায় চার মাস পর ২৩ সেপ্টেম্বর এডিবি চিঠির উত্তর দিয়ে সম্মতির কথা জানায়। তবে শর্ত দেয়, টাকা আগে তাদের কাছে দিতে হবে এবং ঋণচুক্তি করতে হবে। সে প্রক্রিয়া শেষ করতে লেগে যায় পাঁচ মাস।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, টিকার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অর্থায়নে এডিবির অপেক্ষায় কেন বসে থাকতে হবে? অগ্রাধিকার দিলে সরকার নিজের তহবিল থেকেই এ টাকার ব্যবস্থা করতে পারত।
সরকারের নিজস্ব অর্থে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেন টিকা কেনা হয়নি, তা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বৈঠকটি হয় ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
যদিও সরকার টিকা কেনার টাকার একটি অংশের জন্য এডিবির ঋণের ওপরই ভরসা করেছে। ইউনিসেফ টিকার অর্থ (প্রায় এক হাজার কোটি) পায় এপ্রিলে।
উন্মুক্ত বনাম সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি
কোন পদ্ধতিতে টিকা কেনা হবে—উন্মুক্ত দরপত্র, না সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম), তা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দুই মত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দুই মত থেকে যায়।
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে টিকা কেনার পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বড় অংশ সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিলেন।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে লেখা একটি চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এ বি এম আবু হানিফ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয়প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি কেনার সুবিধার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউসিনেফ প্রিফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বাকিতেও টিকা সরবরাহ করে, অর্থাৎ টিকার টাকা পরে পরিশোধ করা যায়।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানকে লেখা চিঠিতে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ফারুখ এ ডুমুন বলেন, টেন্ডার পদ্ধতিতে কিনতে ৮ থেকে ১১ মাস সময় লাগে। অন্যদিকে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি পদ্ধতিতে ২ থেকে ৪ মাসে টিকা কেনা যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার শপথ নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। মার্চ মাসে টিকা কেনার টাকা ছাড় করা হয়। টিকার প্রথম চালান আসে ২০২৬ সালের মে মাসে। তত দিনে দেরি হয়ে গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী টিকা কেনার বিকল্প অন্য একটি উৎসের সম্ভাবনা যাচাই করার চেষ্টা করেছিলেন। ২৩ সেপ্টেম্বর (২০২৫) জাতিসংঘের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ইউএনঅপসের (জাতিসংঘের একটি সংস্থা, যাদের কাজ মানবিক ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করা) পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। তারা জানায়, ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে তাদের মাধ্যমে টিকা কিনলে ১৬ শতাংশ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। বেশ কয়েকটি দেশ ইউএনঅপসের মাধ্যমে ইপিআইয়ের টিকা কেনে।
টিকা কেনা নিয়ে যখন এসব ভিন্ন চিন্তা ও জটিলতা চলছে, তখন মজুত কমে যায়। ২০২৫ সালের ২১ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আফরিন মাহমুদ ইউনিসেফের স্বাস্থ্য শাখার প্রধানকে এক চিঠিতে বলেন, ৩০ জুনের মধ্যে হামসহ চারটি টিকার মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। তিনি অনুরোধ করেন, আগস্ট মাস পর্যন্ত চলার জন্য ইউনিসেফ যেন এই পাঁচ টিকা অগ্রিম সরবরাহ করে।
ইউনিসেফ বাকিতে (প্রিফাইন্যান্সিং) আগস্টের বিভিন্ন তারিখে হামসহ চার ধরনের টিকা সরবরাহ করে। ফলে টিকার সংকট থেকে আপাতত রক্ষা পায় বাংলাদেশ। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারও ২০২৫ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝিতে সরাসরি পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার শপথ নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। মার্চ মাসে টিকা কেনার টাকা ছাড় করা হয়। টিকার প্রথম চালান আসে ২০২৬ সালের মে মাসে। তত দিনে দেরি হয়ে গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে।
বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। একইভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাননি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান।
অনেকে মনে করেন, বিএনপি সরকারও হামের দুর্যোগকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তারা যতটা জোর সমালোচনা করেছে, হাম মোকাবিলায় ঠিক ততটা দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
বিএনপি সরকার কি সামলাতে পারছে
টিকা আসার পর গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকাদান শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হাম-রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হয়। শেষ হয় ২০ মে।
অনেকে মনে করেন, বিএনপি সরকারও হামের দুর্যোগকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তারা যতটা জোর সমালোচনা করেছে, হাম মোকাবিলায় ঠিক ততটা দক্ষতা দেখাতে পারেনি। তারা টিকার জন্য শিশুর নতুন বয়সসীমা ঠিক করেছে। সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস থেকে ৬ মাসে নামিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণা কম হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি সরকার টিকাদানযোগ্য শিশুর সংখ্যা নির্ণয়ে ভুল করেছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ। তারা টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রায় রেখেছে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে, অর্থাৎ ৪৬ লাখ শিশু তারা হিসাবে নেয়নি।
‘ওনাদের তো কষ্ট নেই’
জাতীয় হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইনের শেষ দিন (২০ মে ২০২৬) সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সংবাদ সম্মেলনের পর আড়াই মাস চলে গেছে, তবে হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত শনিবারও মারা গেছে ৬ জন।
বহু মা-বাবা মুমূর্ষু সন্তানের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) একটি শয্যা পেতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গিয়েছেন, কিন্তু সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। বহু পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছে।
এই প্রতিবেদনের শুরুতে যে ফাইয়াজ হাসান তাজিমের কথা বলা হয়েছে, তার চিকিৎসায় চার লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছিলেন তার মা ফারজানা ইসলাম ও বাবা হেলাল ভূঁইয়া। টাকা যতই যাক, মা-বাবা চেয়েছিলেন সন্তান যেন বেঁচে থাকে, কিন্তু তা হয়নি। ফারজানা ইসলাম মে মাসে ফেসবুকে লিখছিলেন, নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, কারও কোনো দায় নেই। কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ মা ও শিশুর।
ফারজানা ঠিকই লিখেছিলেন। পাঁচ মাসে আট শতাধিক শিশুর মৃত্যুর পরও কেউ দায় স্বীকার করেনি, দুঃখ প্রকাশ করেনি।
১০ আগস্ট যোগাযোগ করা হলে ফারজানা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হাম কেন ছড়িয়ে পড়ল, তিনি তার তদন্ত ও বিচার চান। তিনি বলেন, ‘ওনাদের তো কষ্ট নেই। যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, সে জানে সন্তান হারানোর কষ্ট কী!’
ফারজানার এ কথার পর ওপাশ থেকে শুধু ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছিল।