প্রতিবছর ১০ এপ্রিল সিবিলিং ডে পালিত হয়। অনেকেই এদিন ভাই বা বোনের সঙ্গে ছবি শেয়ার করেন, ছোট উপহার দেন, একসঙ্গে সময় কাটান বা তাঁদের স্মৃতি উদ্যাপন করেন। তেমনি এক বোন জানিয়েছেন তাঁর একমাত্র ভাই হারানোর গল্প।

কখনো হঠাৎ নরম আলোর কোনো বিকেলে কিংবা একেবারে নিরিবিলি কোনো মুহূর্তে, স্মৃতিগুলো যেন পাশে এসে বসে চুপচাপ, গভীর এক অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। সেসব মুহূর্তে আমার ছোট্ট ভাইটাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
আমার সেই ছোট ভাই, অনীশ কুমার পাল, আজ সে অনেক দূরে—পাঁচ বছরের বেশি হলো ইহলোকের মায়া কাটিয়ে সে চলে গেছে। তবু মনে হয়, সে যেন ঠিক পাশেই আছে।
ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে—আমার ছোট একটা ভাই থাকবে। বাসায় থাকা বড় গোপাল ঠাকুরের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মাকে বলতাম, ‘আমারও এমন একটা ভাই চাই, গোপালের মতো!’
২০০৫ সালের ২০ আগস্ট সেই চাওয়াটাই সত্যি হয়ে গেল। সেদিন হাসপাতালে গিয়ে আমার যেন আর তর সইছিল না। আগের দিন পাশের কেবিনে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করেছিল। মাকে বারবার বলতাম, ‘ওই বাবুটাকে নিয়ে আসো, আমি ওকে আদর করব, ওর সঙ্গে খেলব!’ আর একই সঙ্গে অধীর হয়ে অপেক্ষা করতাম—আমার ভাই কবে আসবে! অবশেষে যখন সে এল, মা আমাকে বসিয়ে তাকে কোলে তুলে দিয়েছিলেন। সেই প্রথম স্পর্শ আজও হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে সে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল, যেন সেই বন্ধন কোনো দিন আলগা হবে না।
আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর আনন্দে ভরা। একটি চকলেট পেলেও ভাই আমার জন্য নিয়ে আসত, ভাগ করে খেতাম আমরা। একসঙ্গে বসে কার্টুন দেখা ছিল আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। ‘ছোটা ভীম’ ছিল সবচেয়ে পছন্দের কার্টুন। ছোটা ভীম যেমন নানা সমস্যার সহজ সমাধান করে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেত, ঠিক তেমনি আমার ভাইও যেন সবকিছুতে আমার পাশে থেকে আমাকে পথ দেখাত, আমাকে আগলে রাখত। আমার কাছে সে–ই ছিল ছোটা ভীম—শক্তিশালী, নির্ভীক।
ভাই ছিল ভীষণ বুদ্ধিমান। বাবা গণিতের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও আমি যখন সংখ্যার জগতে হাবুডুবু খেতাম, তখন মাঝেমধ্যে আমার এই ছোট্ট ভাই-ই আমাকে সাহায্য করত! বয়সে ছোট হলেও বোঝাপড়া আর দায়িত্বে সে ছিল অনেক বড়।
আমি পাহাড় খুব ভালোবাসি। জীবনের প্রথম পাহাড় ভ্রমণ ছিল ভারতের ত্রিকূট—সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ২৪০০ ফুটের বেশি। সেই পাহাড়ে ট্রেকিং করতে গিয়ে একসময় প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই সে অসাধারণ সতর্কতায় আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল। বাবার সঙ্গে সঙ্গে সেদিন ভাইও আমার পাশে থেকে যেন বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমি একা নই—সব সময় সে আমার পাশে আছে, বড় ভাইয়ের মতো।
২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর—আমার জীবনে এক গভীর শূন্যতার সূচনা করে। তার ঠিক দশ দিন আগেই, ২০ আগস্ট, ঘরোয়া পরিবেশে ভাইয়ের জন্মদিন পালন করেছিলাম। চারদিকে তখন কোভিডের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, ঘরবন্দী জীবন। তবু ছোট্ট করে, নিজেদের মতো করে তাকে খুশি রাখার চেষ্টা ছিল। ৩০ আগস্ট, রোববার, রাতে ওর হালকা জ্বর আসে। পরদিন জ্বর কিছুটা কমলেও শুরু হয় ডায়রিয়া। সারা দিনই সে অসুস্থ ছিল। তাই ১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, ভোরেই তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে করোনা টেস্ট করা না থাকায় তাকে ভর্তি নিল না। অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে পথেই ভাইয়ের সময় যেন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল। সেই অসহায় অপেক্ষার মধ্যেই মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
ভাইয়ের শেষ কথাগুলো আজও কানে বাজে—‘দিদি, টাইম শেষ মনে হয়।’ সে আসলে হাসপাতালের জটিলতার কথাই বোঝাতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর বলা এই কথাগুলো যেন অজান্তেই আমার কাছে এখন গভীর এক অর্থ বহন করে। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু আজ মনে হয়—সেটা ছিল ইহলোকে আমার আর ভাইয়ের একসঙ্গে কাটানো সময় শেষ হওয়ার ইঙ্গিত।
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতাম আমি আর ভাই। দুপুরে ফিরে আমাকে আর ভাইকে একসঙ্গে বসিয়ে খেতে দিত মা। সেই সময় খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক সুখ। এখন সকালে ভার্সিটিতে যাওয়ার পথে যখন দেখি ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে—হঠাৎই মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলো। মনে হয়, সময় কত দ্রুত চলে যায়! আমরা বড় হয়ে গেছি, কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তগুলোর উষ্ণতা এখনো কোথাও রয়ে গেছে, মনের গভীরে, খুব যত্নে জমা হয়ে।
১৫ বছরের যে শৈশব আমরা একসঙ্গে পার করেছি—হাসি, খেলা, ছোট ছোট অভিমান আর অগণিত মুহূর্ত—সবকিছু আজও আমার ভেতরে জীবন্ত হয়ে আছে। সময় এগিয়ে গেলেও তার উপস্থিতির অভাবটা প্রতিদিনই নতুন করে টের পাই।
আজকে দিনটি শুধু নাকি ভাইবোনের জন্য। এই দিনটি এলে আমার ছোট্ট ভাই, আমার ছোটা ভীমের কথা খুব মনে পড়ে। সে শুধু স্মৃতি নয়, সে আমার শৈশব, আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, আমার জীবনের শেষ না হওয়া এক অধ্যায়, জীবনের এক অনন্ত অংশ।